রাজনীতি

জীবন তারেক রহমানকে কী দিয়েছে—আর কী কেড়ে নিয়েছে

  প্রতিনিধি ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ , ২:০৩:৩৪ প্রিন্ট সংস্করণ

জীবন তারেক রহমানকে কী দিয়েছে—আর কী কেড়ে নিয়েছে

মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত একটি নাম তারেক রহমান।তবে রাজনীতির আলো-আঁধারির বাইরে তার ব্যক্তিগত জীবন যে দীর্ঘ এক ট্র্যাজেডির ধারাবাহিকতা—তা খুব কমই আলোচনায় আসে।শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত একের পর এক ভয়,বেদনা ও বিচ্ছেদের মধ্য দিয়েই কেটেছে তার জীবন।

শৈশবেই গৃহবন্দিত্ব

তার বয়স যখন মাত্র ছয়,তখনই ইতিহাসের নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মায়ের সঙ্গে ঢাকায় গৃহবন্দী অবস্থায় কাটে তার নয় মাস।কখনো মৃত্যু এড়াতে পালিয়ে বেড়ানো,কখনো শত্রুপক্ষের কবলে পড়লে যে কোনো মুহূর্তে প্রাণনাশের আশঙ্কা—এই ভয়ই ছিল তার শৈশবের বাস্তবতা।

১১ বছর বয়সে আবার বন্দিত্ব

বয়স যখন এগারো,তখন আবারও গৃহবন্দী হতে হয় তাকে। সিপাহি-জনতার বিদ্রোহের তিনদিনে বাবা-মায়ের সঙ্গে অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন গুনতে থাকেন—কখন পুরো পরিবারসহ জীবনাবসান ঘটবে সেই আশঙ্কায়।

১৫ বছরে পিতৃহারা

কৈশোরে পা দিতেই জীবনে নেমে আসে আরেকটি বড় আঘাত।মাত্র পনেরো বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি।এতিম হয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্তকে পরিবারের ঘনিষ্ঠরা আখ্যা দেন ‘মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো’।

যৌবনে সংগ্রামী মায়ের ছায়া

বিশ বছর বয়স পার করার সময় বারবার নিজের চোখের সামনে দেখেছেন—দুই ছেলেকে রেখে কীভাবে তার মা রাজপথে ও কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন।রাজনৈতিক সংগ্রামে মায়ের এই ত্যাগ তার জীবনের গভীর ছাপ ফেলে।

চল্লিশে পারিবারিক বিপর্যয়

চল্লিশ পেরোনোর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নিজে,তার ভাই এবং মা—পুরো পরিবারই কারাবন্দী হয়। নির্যাতনে তার নিজের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।অন্যদিকে ভাইকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয় কারাগারের ভেতরেই।একই সঙ্গে বৃদ্ধ মাকেও বন্দি রাখা হয়।

বিদেশে চিকিৎসা,দেশে শোক

কারামুক্তির পর তিনি চিকিৎসার জন্য যান লন্ডনে,আর ভাই পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়।নিজে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও ভাই আর ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে।পরিবারে বাবার অনুপস্থিতিতে বড় ভাইই ছিলেন ছোটদের অভিভাবক।সেই বড় ভাইয়ের মৃত্যু হয়।জানাজা ও দাফন—সবই দেখতে হয় দূর থেকে,নির্বাক সাক্ষী হয়ে।

পঞ্চাশে মায়ের একাকী কারাবাস

পঞ্চাশে পা দেওয়ার পর দেখেন আরও এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অসুস্থ,বৃদ্ধ মাকে পাঠানো হয় পরিত্যক্ত এক ভুতুড়ে কারাগারে—যেখানে একমাত্র বন্দি ছিলেন তিনি।দিনের পর দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সেখানে সময় কাটান সেই মা।

শেষ দেখা ও চূড়ান্ত বিদায়

পরবর্তীতে মুক্তি পেলেও মাকে যেতে দেওয়া হয়নি তার একমাত্র জীবিত সন্তানের কাছে।বয়স যখন প্রায় ষাট,তখন আল্লাহর রহমতে সময়ের পরিবর্তন আসে।জুলাই মাসে বড় ছেলের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়ে তিনি দেশে ফেরেন।তারেক রহমান নিজেও দেশে ফেরেন,কিন্তু আসার এক সপ্তাহ না যেতেই চিরবিদায় নেন তার মমতাময়ী মা।

সব হারানোর হিসাব

বাবা নেই,ছোট ভাই নেই, এখন মা-ও নেই।এই পৃথিবীতে আপন বলতে আর কেউ রইল না—এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে: জীবন তারেক রহমানকে কী দিয়েছে?

বিশ্লেষকদের মতে,রাজনীতি তাকে পরিচিতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সে যা পেয়েছে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি হারিয়েছে। শৈশবের ভয়,যৌবনের সংগ্রাম,মধ্য বয়সের কারাবাস আর বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা—সব মিলিয়ে তার জীবন এক দীর্ঘ বেদনার উপাখ্যান।

এই গল্প শুধু একজন রাজনীতিকের নয়; এটি ক্ষমতা,সংঘাত ও সময়ের নিষ্ঠুরতার সামনে একটি পরিবারের টিকে থাকার লড়াইয়ের দলিল।

আরও খবর

Sponsered content