সম্পাদকীয়

ভোটার তালিকায় বৈষম্য: এটি কি প্রশাসনিক অনিয়ম, নাকি সংবিধান লঙ্ঘনের ধারাবাহিক অপরাধ?

  প্রতিনিধি ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৫:১৫:২৯ প্রিন্ট সংস্করণ

ভোটার তালিকায় বৈষম্য: এটি কি প্রশাসনিক অনিয়ম, নাকি সংবিধান লঙ্ঘনের ধারাবাহিক অপরাধ?

মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশে ভোটাধিকার কাগজে মৌলিক অধিকার হলেও বাস্তবে তা হয়ে উঠেছে ক্ষমতার মাপকাঠি। একজন সাধারণ নাগরিক বছরের পর বছর নির্বাচন কমিশনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভোটার হতে না পারলেও, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র যেন মুহূর্তেই জেগে ওঠে।এই বৈষম্য আর প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়—এটি আইনের শাসনের সরাসরি অস্বীকার।

প্রশ্ন উঠছে—
এটি কি কেবল অনিয়ম,
নাকি সংবিধান ভঙ্গ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার?

সংবিধান লঙ্ঘন: এখানে শুধু ব্যর্থতা নয়,দায়ও আছে

বাংলাদেশের সংবিধান অত্যন্ত স্পষ্ট।

▶ অনুচ্ছেদ ২৭

আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান।
কিন্তু ভোটার নিবন্ধনে যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা গতি,আলাদা সুবিধা থাকে—তাহলে এই অনুচ্ছেদ কার্যত বাতিল হয়ে যায়।

▶ অনুচ্ছেদ ৩১

প্রত্যেক নাগরিক আইনের সুরক্ষা পাবে।
ভোটার হওয়া যদি সাধারণ মানুষের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়,তবে রাষ্ট্র নিজেই তার সুরক্ষা প্রত্যাহার করছে।

▶ অনুচ্ছেদ ১১

জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস।
কিন্তু জনগণকে ভোটার তালিকা থেকেই বঞ্চিত করা হলে এই অনুচ্ছেদ একটি ফাঁপা স্লোগানে পরিণত হয়।

এগুলো কেবল নৈতিক ব্যর্থতা নয়—এগুলো সংবিধান লঙ্ঘনের কাঠামোগত আলামত।

নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকা আইন: নিরপেক্ষতা কোথায়?

▶ ভোটার তালিকা আইন,২০০৯

এই আইনে ভোটার তালিকা হালনাগাদ একটি নিয়মতান্ত্রিক, সমান ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া হিসেবে নির্ধারিত।
কোথাও লেখা নেই—

রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে দ্রুত হবে

সাধারণ নাগরিক হলে বিলম্ব হবে

যদি বাস্তবে তা-ই ঘটে, তাহলে তা আইন প্রয়োগে বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার।

▶ জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন, ২০১০

এনআইডি প্রদান একটি প্রশাসনিক সেবা—কোনো বিশেষ সুবিধা নয়।
২৪ ঘণ্টায় কারও এনআইডি তৈরি হওয়া আর বছরের পর বছর আটকে থাকা—এই পার্থক্য আইনের চোখে বৈধ হতে পারে না।


তফসিল ঘোষণার পর ভোটার হওয়া: আইন কী বলে?

▶ Representation of the People Order (RPO), 1972

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ভোটার তালিকা সংশোধন ও অন্তর্ভুক্তি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

▶ নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপন ও বিধিমালা

তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত—

নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি স্থগিত

শুধু সীমিত সংশোধনের সুযোগ

এই অবস্থায় যদি কেউ দ্রুত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—
এই প্রক্রিয়া কোন আইনের বলে,কোন প্রজ্ঞাপনের অধীনে?

আইনের ব্যতিক্রম যদি কেবল ক্ষমতাবানদের জন্য হয়, তবে সেটি আইন নয়—আইনের মুখোশে বৈষম্য।

রাষ্ট্রদ্রোহের প্রশ্ন: এখানে কেন এই শব্দটি আসছে?

বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১২৪(ক) ধারা রাষ্ট্রদ্রোহকে ব্যাখ্যা করে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ক্ষুণ্ন করার কর্মকাণ্ড হিসেবে।
এখানে প্রশ্ন হলো—

যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে

সংবিধান অকার্যকর করে

জনগণের ভোটাধিকার খর্ব করে

আইনকে শ্রেণিভিত্তিক করে তোলে

তাহলে কি তা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তিকে দুর্বল করে না?

এটি কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলা নয়—
এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে জন্ম নেওয়া সংবিধানবিরোধী আচরণের বিপজ্জনক প্রবণতা চিহ্নিত করা।

শেষ কথা: এটি শুধু ভোটার তালিকার প্রশ্ন নয়

এটি গণতন্ত্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
এটি রাষ্ট্র কার—সেই প্রশ্ন।

যদি ভোটাধিকারেই সমতা না থাকে,
তবে নির্বাচন একটি নাটক,
সংবিধান একটি সাজসজ্জা,
আর জনগণ কেবল ব্যবহারযোগ্য উপকরণ।

বাংলাদেশ বলে কথা।
কিন্তু এই বাংলাদেশ যদি আইনের চোখে সবার এক না হয়,
তাহলে একদিন জনগণই প্রশ্ন তুলবে—
এই রাষ্ট্র কার স্বার্থে চলে?

এ প্রশ্ন উপেক্ষা করলে,
ইতিহাস কোনো নির্বাচন কমিশন, কোনো সরকারকে ছাড় দেয় না।

আরও খবর

Sponsered content