প্রতিনিধি ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ , ২:১৪:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা নিম্নমুখী ও স্থানীয় বাজারে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমবে।তবে আগামী বছর থেকে আবার ঘুরে দাঁড়াবে শীর্ষ পণ্য রপ্তানি আয়ের এই খাত। বছরে গড়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হবে।তাতে ২০২৬ সালে তৈরি পোশাকের রপ্তানি ৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে দাঁড়াবে।গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে ৪ হাজার ৫৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছিল।

দেশে বিনিয়োগ ব্যাংকিং ও ব্রোকারেজ হাউস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ক্যাল বাংলাদেশের এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়েছে।জানুয়ারিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ক্যাল গ্রুপের উপস্থিতি শ্রীলঙ্কায় রয়েছে।
ক্যাল বাংলাদেশের পূর্বাভাস—চলতি বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি দশমিক ৯ শতাংশ কমবে।তবে আগামী বছর ৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে।পরের দুই বছর যথাক্রমে ৭ দশমিক ২ এবং ৬ দশমিক ৭ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হবে।আগামী বছর থেকে পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে তিনটি বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।সেগুলো হচ্ছে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি,চীন থেকে ক্রয়াদেশ স্থানান্তর এবং বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণ।
সারা বিশ্বে যে পরিমাণ পোশাক বিক্রি হয়,তার ৭৩ শতাংশ কৃত্রিম তন্তুর (এমএমএফ)।বাকি ২৭ শতাংশ তুলা দিয়ে তৈরি সুতার।আর বাংলাদেশের রপ্তানি করা পোশাকের মাত্র ২৬ শতাংশ কৃত্রিম তন্তুর।যদিও বাজারটি ধরতে বাংলাদেশ দ্রুত এগোচ্ছে।কৃত্রিম তন্তুর কাপড় উৎপাদনে বস্ত্র খাতে ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগ বেড়েছে ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট।আবার কৃত্রিম তন্তুর আমদানি করোনার আগের সাত বছরে গড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশ হারে বেড়েছে।
অন্যদিকে কৃত্রিম তন্তুতে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও (এফডিআই) বাড়ছে।গত চার বছরে কৃত্রিম তন্তুতে দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৭ কোটি ৯০ লাখ, হংকংয়ের ৩৬ কোটি ৮০ লাখ এবং চীনের ২৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগ এসেছে।
এদিকে পোশাকশ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি,বাণিজ্য যুদ্ধ,জিরো কোভিডসহ নানা কারণে চীনের ওপর অতি নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে ও ইউরোপের ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানগুলো।যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে চীন তৈরি পোশাকের বাজার হিস্যা হারিয়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। তার বিপরীতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের বাজার হিস্যা বেড়েছে যথাক্রমে ২ দশমিক ২ এবং ৪ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে অর্থাৎ ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চীনের তৈরি পোশাকের গড় রপ্তানি ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।আর বাংলাদেশের বেড়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
ক্যাল বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে গড়ে চীনের শ্রমিকের মজুরি ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ হারে বেড়েছে।গত বছর চীনের সাংহাইয়ে মাসে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ছিল ৩৭৫ ডলার।একই সময়ে ভিয়েতনামে ১৯৮ ও বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ছিল ৭৫ ডলার।তার মানে,বাংলাদেশের চেয়ে চীনের শ্রমিকের মজুরি ৪ গুণ বেশি। শ্রমিকের এই কম মজুরি বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখবে।
অন্যদিকে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছে।বর্তমানে অপ্রচলিত বাজারে হিস্যা ৮ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১০ শতাংশে দাঁড়াবে।আবার রপ্তানিতে বৈচিত্র্যও বাড়ছে।২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৬২ শতাংশই ছিল ট্রাউজার ও টি-শার্ট।গত অর্থবছর সেটি কমে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।তার মানে,বেশি মূল্য সংযোজিত হয় এমন পোশাক রপ্তানিতে জোর দিচ্ছেন পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা।
ক্যাল বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী,বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির একটি সম্পর্ক রয়েছে।রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চলতি বছর বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।তাতে পোশাক রপ্তানিও কমবে।অন্যদিকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে।যদিও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও তুলার দাম হ্রাস পাওয়ায় সেই চাপ কমানোর সুযোগ পাবেন।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আমাদেরও ধারণা,চলতি বছর খারাপ যাবে। আগামী বছর থেকে রপ্তানি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাতে ২০২৬ সালে পোশাক রপ্তানি ৫৬ বিলিয়নের চেয়ে বেশি হবে।তার কারণ,চীন,ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার ওপর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের আস্থা কমে এসেছে।অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত কর্মপরিবেশসম্পন্ন সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ।











