সম্পাদকীয়

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সামনে কঠিন বাস্তবতা: রাষ্ট্র বাঁচাতে কৌশল বদল অনিবার্য

  প্রতিনিধি ২২ জানুয়ারি ২০২৬ , ৫:১৩:১৩ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা এনে দেয়নি; এটি একটি রাষ্ট্রীয় দর্শন, একটি সার্বভৌম চেতনা ও একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক মানচিত্র রচনা করেছিল।সেই মানচিত্রের মূল শত্রু ছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি—যারা অস্ত্র হাতে,অর্থের জোরে কিংবা ধর্মের অপব্যবহার করে রাষ্ট্রকে বারবার অস্থিতিশীল করেছে। আজ দুঃখজনক হলেও সত্য,সেই শক্তিগুলো আবার দৃশ্যমানভাবে সক্রিয়,আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা।

আইনগত বাস্তবতা হচ্ছে—বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞা,মামলা,প্রশাসনিক চাপ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে কার্যকর নির্বাচনী অংশগ্রহণের অবস্থানে নেই।এটি আবেগের নয়,বরং নির্মম আইনি সত্য।নির্বাচন কমিশনের কাঠামো,মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ও বিচারিক পরিবেশ—কোনোটিই আওয়ামী লীগের জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। এই অবস্থায় “স্বাভাবিক নির্বাচনী লড়াই”-এর কথা বলা রাজনৈতিক রোমান্টিসিজম ছাড়া কিছু নয়।

সামাজিক বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক।রাষ্ট্রের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিকল্পিত ডি-লিবারালাইজেশন চলছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা,সংবিধানের মূলনীতি,অসাম্প্রদায়িকতা—এসবকে ‘একপেশে ইতিহাস’ আখ্যা দিয়ে জনমত বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।এই সামাজিক পুনর্গঠনের পেছনে রয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী ও জঙ্গিবাদী মতাদর্শের সরাসরি বা পরোক্ষ প্রভাব।এই শক্তিগুলোর হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা গেলে ১৯৭১-এর পরাজয় পূর্ণতা পাবে—এ কথা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।

রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি: রাষ্ট্র রক্ষা জরুরি,না দলীয় ক্ষমতা?মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সামনে আজ বিকল্প পথ নেই—এটি কঠোর সত্য।আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল যদি কৌশলগতভাবে একত্রিত হয়ে স্বাধীনতাবিরোধী জোটকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে চায়,তবে প্রচলিত দলীয় অহংকার ও প্রতীকের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় পার্টিকে একটি কৌশলগত অন্তর্বর্তী দেয়াল হিসেবে বিবেচনা করা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হলেও বাস্তবসম্মত।জাতীয় পার্টি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক বাহক নয়—এ কথা সত্য।কিন্তু বর্তমান সমীকরণে তারা স্বাধীনতাবিরোধী জঙ্গি ও সন্ত্রাসী রাজনীতির সরাসরি বাহনও নয়।রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুযায়ী,কখনো কখনো আদর্শগত বিশুদ্ধতার চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা অগ্রাধিকার পায়।

১৪ দলের ভোটারদের “না ভোট” বা জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান কোনো আত্মসমর্পণ নয়; এটি একটি ডিফেন্সিভ ডেমোক্রেটিক স্ট্র্যাটেজি।লক্ষ্য ক্ষমতা দখল নয়—লক্ষ্য রাষ্ট্রকে জঙ্গিবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাত থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা করা।এই কৌশলে জয়ী হতে পারলেই তথাকথিত ‘২৪-এর জুলাই সনদ’ বাতিলের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে নিরাপদ রাজনৈতিক আশ্রয় ও পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে।

যারা এটিকে “নৈতিক পরাজয়” বলবেন,তাদের মনে রাখা উচিত—রাষ্ট্র ধ্বংস হলে নৈতিকতার কবরও রচিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা করতে হলে কেবল স্লোগান নয়, কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা সময়মতো কৌশল বদলায় না,তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।

আজ আওয়ামী লীগের সামনে প্রশ্ন একটাই: দল বাঁচাবেন, না দেশ বাঁচাবেন? বাস্তবতা বলছে—এই মুহূর্তে দুইটি একসাথে সম্ভব নয়।দেশ বাঁচাতে হলে বিকল্প পথ নিতে হবে।কঠিন হলেও সেটিই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা।

আরও খবর

Sponsered content