সম্পাদকীয়

এসআই সন্তোষকে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে হত্যা,থানায় ঢুকে স্বীকারোক্তি—এ কোন বাংলাদেশ?

  প্রতিনিধি ২ জানুয়ারি ২০২৬ , ৬:৪২:৪১ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে হত্যা—এটি যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ না হয়,তবে যুদ্ধ কাকে বলে? আর সেই হত্যার স্বীকৃতি যদি থানার ভেতর ঢুকে,ওসির টেবিলে থাপ্পড় মেরে দেওয়া হয়—তবে সেটি কেবল অপরাধ নয়,সেটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রকাশ্য অপমান।

বানিয়াচংয়ে এসআই সন্তোষ হত্যাকাণ্ড আজ আর “অভিযোগ” পর্যায়ে নেই।বিবিসি নিউজের অনুসন্ধানী রিপোর্ট, প্রকাশ্যে দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং থানায় ঢুকে হুমকি প্রদর্শনের ভিডিও—সব মিলিয়ে এটি একটি প্রামাণ্য রাষ্ট্রব্যর্থতার মামলা।

আইন কোথায় ভেঙেছে: ফৌজদারি অপরাধের নগ্ন তালিকা

এই ঘটনায় বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে একাধিক গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—

দণ্ডবিধি ১৮৬০

ধারা ৩০২: পরিকল্পিত হত্যা

ধারা ৩৪/১০৯: যৌথ অপরাধ ও উসকানি

ধারা ১৪৩–১৪৭: অবৈধ সমাবেশ ও দাঙ্গা

ধারা ৩৩২/৩৫৩: কর্তব্যরত সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা

ধারা ৫০৬: ফৌজদারি ভয়ভীতি প্রদর্শন

বিশেষ ক্ষমতা আইন,১৯৭৪

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা

সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (সংশোধিত)

ধারা ৬ ও ৭: জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা

ডিজিটাল প্রমাণ আইন

ভিডিও ফুটেজ,স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া রিপোর্ট বিচারযোগ্য আলামত

আইনের ভাষায় এটি একটি ক্যাপিটাল অফেন্স।এখানে জামিন প্রশ্নই ওঠে না।প্রশ্ন ওঠে—গ্রেপ্তার কেন হয়নি?

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: অপরাধ যখন পরিচয়ে ঢেকে যায়

সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো—অভিযুক্তরা রাজনৈতিক পরিচয় বা “সমন্বয়ক” তকমা নিয়ে থানায় প্রবেশ করে। এটি স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশে এক শ্রেণির মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছে—ক্ষমতার ছায়ায় থাকলে আইন প্রয়োগ হয় না।

রাজনীতি যদি খুনিকে রক্ষা করে,
তবে রাজনীতি আর গণতন্ত্র থাকে না—
তা হয়ে ওঠে সহিংসতার লাইসেন্স।

নিরাপত্তা বিশ্লেষণ: থানার ভেতরেও যদি পুলিশ নিরাপদ না থাকে

থানার ভেতরে ঢুকে ওসিকে হুমকি,টেবিলে থাপ্পড়—এটি শুধু একজন ওসির অপমান নয়,এটি পুরো পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভাঙার কৌশল।আজ যদি থানা অরক্ষিত হয়,কাল আদালত,পরশু সচিবালয়—এই ঢালু পথে রাষ্ট্র বেশিদিন দাঁড়াতে পারে না।

এটি Internal Security Failure—যার দায় শুধু স্থানীয় প্রশাসনের নয়,কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের।

মানবাধিকার বিশ্লেষণ: নিহত পুলিশও মানুষ

মানবাধিকার কেবল অভিযুক্তের জন্য নয়—নিহত এসআই সন্তোষও একজন মানুষ, একজন নাগরিক,একজন রাষ্ট্রীয় কর্মচারী। তাঁকে বিচার ছাড়াই প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে—এটি Extrajudicial Lynching,যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ।

রাষ্ট্র যদি নিজের কর্মচারীর জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষা একটি ফাঁকা বুলি ছাড়া কিছু নয়।

বিচার বিশ্লেষণ: নীরবতা মানেই সহযোগিতা

এই ঘটনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়—নীরবতা।
নীরব প্রশাসন,নীরব রাজনৈতিক নেতৃত্ব,নীরব আইন প্রয়োগ।

ইতিহাস বলে— যেখানে রাষ্ট্র নীরব থাকে,
সেখানে অপরাধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

আজ যদি থানার ভেতরের স্বীকারোক্তির পরও গ্রেপ্তার না হয়,
তবে সেটি বিচারহীনতা নয়—
সেটি রাষ্ট্রীয় সম্মতি।

শেষ কথা: বানিয়াচং কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

বানিয়াচং একটি নাম মাত্র।
আসল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে আইন শক্তিশালী, না উন্মত্ত জনতা?

এই হত্যাকাণ্ডের বিচার যদি দৃষ্টান্তমূলক না হয়,
তবে আগামী দিনে লাশ ঝুলবে আরও,
আর রাষ্ট্র প্রতিবার বলবে—“তদন্ত চলছে।”

কিন্তু একটি রাষ্ট্র কত লাশের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?


আরও খবর

Sponsered content