রাজনীতি

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী থেকে কারাবাস—খালেদা জিয়ার উত্থান-পতনের রাজনীতি

  প্রতিনিধি ১ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:৪৫:০৬ প্রিন্ট সংস্করণ

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী থেকে কারাবাস—খালেদা জিয়ার উত্থান-পতনের রাজনীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এমন এক নাম,যাকে এড়িয়ে কোনো অধ্যায়ই লেখা যায় না।তিনবারের প্রধানমন্ত্রী,স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মুখ,আবার একই সঙ্গে তীব্র বিরোধ,মামলা ও কারাবাসের প্রতীক—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল উত্থান–পতনের এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা।

ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া এই নারী একসময় হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।তাঁর নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হয়েছে—এটি যেমন ইতিহাসের মিষ্টি অধ্যায়,তেমনি শাসনামলের দুর্নীতি অভিযোগ,প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল তিক্ত বাস্তবতা।

তবে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকেও একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই—খালেদা জিয়া বিএনপিকে শুধু নেতৃত্ব দেননি, তিনি দলটির আবেগ,পরিচয় ও রাজনৈতিক ভাষাকেই গড়ে দিয়েছেন।মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন সমর্থকদের কাছে আশার প্রতীক,আর বিরোধীদের কাছে কঠোর সমালোচনার কেন্দ্র।

এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কোনো পক্ষপাত নয়—খালেদা জিয়ার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রাজনৈতিক জীবনকে ঝাল, টক ও মিষ্টি—তিন স্বাদের বাস্তবতায় তথ্য ও বিশ্লেষণের আলোকে তুলে ধরা হয়েছে।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯৪৫,ভারতের তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলার নয়াবস্তি এলাকায়।দেশভাগ-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা,স্থানান্তর ও সামাজিক বাস্তবতা তাঁর পারিবারিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।তাঁর পিতা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী; পরিবারটি পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

এই জন্মস্থান নিয়ে বাংলাদেশি রাজনীতিতে বহুবার বিতর্ক ও ট্রল হয়েছে—বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে। তবে আইনগত ও নাগরিক পরিচয়ের বিচারে খালেদা জিয়া আজীবন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পরিচিত।

শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবন

খালেদা জিয়া ঢাকায় শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন।ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৬০ সালে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান-কে বিয়ে করেন।দাম্পত্য জীবনে তাঁদের দুই পুত্র—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো।

এই দাম্পত্য সম্পর্কই পরবর্তীতে তাঁকে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

১৯৭৫–১৯৮১: রাজনৈতিক বাস্তবতার নাটকীয় মোড়

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি হন।

৩০ মে ১৯৮১—চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন।এই হত্যাকাণ্ড খালেদা জিয়ার জীবনে ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মোড় ঘুরিয়ে দেয়।স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

বিএনপির নেতৃত্বে উত্থান

১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়া রাজনীতিতে দৃশ্যমান হন।

১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে যুগপৎ ভূমিকা রাখেন,যা ১৯৯০ সালে এরশাদ পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিন দফা ক্ষমতা

খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন:

১. ১৯৯১–১৯৯৬: সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের সময়কাল

২. ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬: স্বল্পমেয়াদি ও বিতর্কিত নির্বাচন

৩. ২০০১–২০০৬: চারদলীয় জোট সরকারের সময়কাল

এই সময়গুলোতে অর্থনীতি,অবকাঠামো ও প্রশাসনে কিছু অগ্রগতি যেমন হয়েছে,তেমনি দুর্নীতি,জঙ্গিবাদ উত্থান,২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা,বাংলা ভাই ইস্যু—এসব ঘটনায় তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

২০০৭–২০০৮: ওয়ান-ইলেভেন ও রাজনৈতিক ধাক্কা

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থায় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন।সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি মামলা দায়ের হয়।

এই সময় থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে।

মামলা,দণ্ড ও কারাবাস

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা

এসব মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত হন এবং দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন।বিএনপির দাবি—এসব মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপ্রসূত।সরকারপক্ষের দাবি—আইনের শাসনের অংশ।

এই দ্বন্দ্ব আজও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম মেরুকরণকারী ইস্যু।

স্বাস্থ্য সংকট ও মানবিক বিতর্ক

কারাবাসের সময় খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থতায় ভোগেন। তাঁর লিভার,হার্ট ও আর্থ্রাইটিসজনিত জটিলতা নিয়ে দেশ-বিদেশে চিকিৎসা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক হয়।

মানবিক বিবেচনায় তাঁকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হলেও বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলমান থাকে।

মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া

মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন।মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮০ বছর।

পরদিন (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫) বুধবার,পারিবারিক ও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে দাফন করা হয়।তাঁর মৃত্যুতে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে সাত দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করে।

রাষ্ট্রপতি,প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা প্রদান করে।তবে তাঁর দাফন ও শোকানুষ্ঠান ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ,নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জনসমাগম নিয়ে নতুন বিতর্কও সৃষ্টি হয়।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে—যেখানে তিনি ছিলেন একই সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্র,বিরোধিতার প্রতীক এবং বিতর্কের নাম।

ক্ষমতা,বিতর্ক ও উত্তরাধিকার: একটি বিশ্লেষণ

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কেবল ব্যক্তি খালেদা জিয়ার নয়; এটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা,সামরিক প্রভাব,গণতন্ত্র ও প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ।স্বামী জিয়াউর রহমানের হত্যার পর রাজনীতিতে তাঁর উত্থান অনেকাংশেই ছিল সহানুভূতি ও সাংগঠনিক শূন্যতার ফল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে এক স্বতন্ত্র ক্ষমতাকেন্দ্রে রূপান্তরিত করেন।

তাঁর শাসনামলে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন একটি ঐতিহাসিক অর্জন হলেও,একই সঙ্গে বিরোধী দল দমন, প্রশাসনের দলীয়করণ ও দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষয় করেছে।বিশেষ করে ২০০১–২০০৬ মেয়াদে জঙ্গিবাদের উত্থান ও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে ওঠে—যার দায় রাজনৈতিকভাবে তাঁর সরকারের ওপরই বর্তায়।

ভারত প্রশ্ন ও দ্বিচারিতার রাজনীতি

খালেদা জিয়ার জন্মস্থান ভারতের জলপাইগুড়ি হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ভারতবিরোধী রাজনীতিকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,এটি ছিল আদর্শগত অবস্থানের চেয়ে বেশি ভোটব্যাংক ও আবেগনির্ভর রাজনীতি।প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে জন্ম বা আত্মীয়তার যোগসূত্রকে ‘দেশপ্রেমের মানদণ্ড’ বানালেও নিজেদের ক্ষেত্রে সেটিকে ইতিহাসের অনিবার্যতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—যা স্পষ্ট দ্বিচারিতা।

মামলা,কারাবাস ও ‘ভিকটিম ন্যারেটিভ’

দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে বিএনপি একটি ‘ভিকটিম ন্যারেটিভ’-এর কেন্দ্রে স্থাপন করে। এতে দলীয় কর্মীদের সংহতি তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে তোলে।কারণ রাজনীতি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার পিছিয়ে যায়।

মৃত্যুর পর রাজনীতি: কী রেখে গেলেন খালেদা জিয়া?

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিএনপি একটি আবেগী প্রতীক হারাল।তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই মৃত্যু কি দলকে ঐক্যবদ্ধ করবে,নাকি নেতৃত্ব সংকটকে আরও প্রকট করবে?

একদিকে তিনি ছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মুখ, অন্যদিকে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীক।এই দ্বৈত পরিচয়ই খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনন্য করে তুলেছে।

উপসংহার

খালেদা জিয়ার জীবনগাঁথা প্রমাণ করে—বাংলাদেশের রাজনীতি ব্যক্তিনির্ভর হলে তা যেমন দ্রুত উত্থান ঘটায়,তেমনি পতনও অনিবার্য করে তোলে।তাঁর মৃত্যু একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু রেখে গেছে বহু অনিষ্পন্ন প্রশ্ন—গণতন্ত্র কি ব্যক্তি ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে,নাকি ইতিহাস আবারও একই চক্রে ঘুরবে?

আরও খবর

Sponsered content