রাজনীতি

“সংখ্যার রাজনীতি: ‘সাত কোটি সমর্থক’ দাবি, নির্বাচন, গণ-অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগের উত্থান–পতনের দলিল”

  প্রতিনিধি ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ , ২:১২:০১ প্রিন্ট সংস্করণ

“সংখ্যার রাজনীতি: ‘সাত কোটি সমর্থক’ দাবি, নির্বাচন, গণ-অভ্যুত্থান ও আওয়ামী লীগের উত্থান–পতনের দলিল”

মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্য,আইনের শাসন,অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতিফলন।সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্য—“সাত কোটি মানুষ সরাসরি আওয়ামী লীগ করে,কতজনকে আপনি ভয় দেখাবেন?”—এই প্রেক্ষাপটে ঐতিহাসিক নির্বাচন ফলাফল, জনসমর্থনের পরিমাপ,এবং রাজনৈতিক-আইনি বাস্তবতা একত্রে বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে উঠেছে।

> নোট: ভোটের শতাংশ/ফলাফল সরকারি ঘোষণার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।কয়েকটি নির্বাচনে বিরোধী দলের বর্জন/অংশগ্রহণ সীমিত থাকায় ভোটের শতাংশ জনসমর্থনের নিখুঁত প্রতিফলন নয়—এ বিষয়টি বিশ্লেষণে বিবেচিত।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনসমূহ (১ম–১২তম): তারিখ,ফলাফল ও ভোটের শতাংশ (সংক্ষিপ্ত সারণি)

ক্রম নির্বাচন তারিখ প্রধান বিজয়ী আনুমানিক ভোট % (বিজয়ী) বিশেষ প্রেক্ষাপট

১ম ১৯৭৩ ৭ মার্চ ১৯৭৩ আওয়ামী লীগ ~৭৩% স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচন
২য় ১৯৭৯ ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ বিএনপি ~৪১% সামরিক শাসনোত্তর
৩য় ১৯৮৬ ৭ মে ১৯৮৬ জাতীয় পার্টি ~৪২% সামরিক শাসন, বিতর্ক
৪র্থ ১৯৮৮ ৩ মার্চ ১৯৮৮ জাতীয় পার্টি ~৫৪% প্রধান দলগুলোর বর্জন
৫ম ১৯৯১ ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ বিএনপি ~৩০.৮% তত্ত্বাবধায়ক-পরবর্তী, সংসদীয় ব্যবস্থা
৬ষ্ঠ ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি) ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ — — বর্জিত/অকার্যকর
৭ম ১৯৯৬ (জুন) ১২ জুন ১৯৯৬ আওয়ামী লীগ ~৩৭.৪% তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় নির্বাচন
৮ম ২০০১ ১ অক্টোবর ২০০১ বিএনপি জোট ~৪১% ক্ষমতার পালাবদল
৯ম ২০০৮ ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ আওয়ামী লীগ জোট ~৫৭% জরুরি অবস্থার পর
১০ম ২০১৪ ৫ জানুয়ারি ২০১৪ আওয়ামী লীগ ~৭৮% প্রধান বিরোধী দলের বর্জন
১১তম ২০১৮ ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ আওয়ামী লীগ ~৭৪% অনিয়মের অভিযোগ
১২তম ২০২৪ ৭ জানুয়ারি ২০২৪ আওয়ামী লীগ ~৭৫% বিরোধী বর্জন/নিম্ন অংশগ্রহণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

জনসমর্থনের দাবি বনাম নির্বাচনী বাস্তবতা

‘৭ কোটি সমর্থক’—এটি রাজনৈতিক বক্তব্য; নির্বাচনী ভোটশেয়ার কখনোই দেশের মোট জনসংখ্যার এমন অনুপাতকে সরাসরি প্রতিফলিত করেনি।

বর্জিত নির্বাচন (২০১৪,২০২৪) উচ্চ ভোটশেয়ার দেখালেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাব জনসমর্থনের প্রকৃত চিত্রকে অস্পষ্ট করে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন (১৯৯১,১৯৯৬-জুন,২০০১, ২০০৮) সময়গুলোতে ভোটশেয়ার তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি ছিল।

দলীয় শক্তির ওঠানামা

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলেরই জনসমর্থন সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা,প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এখানে নির্ধারক।

সামাজিক বিশ্লেষণ

দীর্ঘমেয়াদি শাসনকালে দলীয়করণ,মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা ও সহিংস রাজনীতি সামাজিক বিভাজন বাড়িয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান সামাজিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আলোচিত।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

অবকাঠামো ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমান হলেও দুর্নীতি, বৈষম্য,মূল্যস্ফীতি জনজীবনে চাপ সৃষ্টি করেছে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

আইনি বিশ্লেষণ

সংবিধান: জনগণের ভোটাধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা।

নির্বাচন আইন: সমান সুযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অপরিহার্য।

২০২৫ প্রেক্ষাপট: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম আইনগতভাবে স্থগিত—এটি দলীয় রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থায় নতুন আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করছে।

‘সাত কোটি সমর্থক’ বক্তব্যটি রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে প্রচলিত হলেও,নির্বাচনী ফলাফল,বর্জন,অংশগ্রহণের হার ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে জনসমর্থনের চিত্র জটিল ও বহুমাত্রিক।টেকসই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক,প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা।

আরও খবর

Sponsered content