সম্পাদকীয়

১৭ বছর পরে : তারেক রহমান ২.০ — বিনয়ী উচ্চারণ, কঠোর বার্তা

  প্রতিনিধি ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৫:০১:২৬ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।১৭ বছর পর তারেক রহমানের ফিরে আসা কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার প্রত্যাবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভাষা,ভঙ্গি ও মনস্তত্ত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের ইঙ্গিত।তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি শুরু থেকেই যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক বয়ান হাজির করেছেন—পাহাড় থেকে সমতল,ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-প্রজন্ম নির্বিশেষে—তা সচরাচর এই ভূখণ্ডে খুব কমই দেখা যায়। যারা বক্তব্যটি শুনেছেন,অনেকেই নিজেদের সেখানে খুঁজে পেয়েছেন।এটি কেবল আবেগ নয়,এটি রাজনৈতিক সংযোগ তৈরির একটি সচেতন কৌশল।

তিনি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন,ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন,মায়ের জন্য দোয়া চেয়েছেন এবং শহীদ হাদির আত্মত্যাগ স্মরণ করে বক্তব্য শুরু করেছেন।এই সূচনাই বলে দেয়—তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা। মার্টিন লুথার কিংয়ের “I have a plan” উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি স্বপ্নের কথা বলেছেন,কিন্তু সে স্বপ্ন উচ্ছৃঙ্খল নয়; বরং শান্তি,শালীনতা ও দায়িত্ববোধে বাঁধা।

ব্যক্তিগত আবেগের জায়গাটিও তিনি আড়াল করেননি। হাসপাতালে থাকা মায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন—যে মানুষের জন্য তার মায়ের আজীবনের সংগ্রাম,তাদের সঙ্গেই দেখা করতেই তিনি এসেছেন।এটি একদিকে মানবিক, অন্যদিকে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার স্পষ্ট উচ্চারণ।

তারেক রহমান ১.০ ও ২.০–এর মাঝে সময়ের ব্যবধান ১৭ বছর।আদর্শিক অবস্থানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন না থাকলেও একটি পার্থক্য চোখে পড়ে—বিনয়। একসময় তিনি ছিলেন কঠোর,দৃঢ় ও আপসহীন।সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির সন্তান,প্রধানমন্ত্রীর পুত্র—এই পটভূমিতে তার ব্যক্তিত্বে দৃঢ়তা ও রুঢ়তা থাকা অস্বাভাবিক ছিল না।কিন্তু সেই কঠোরতা দলের ভেতরে কিছু দূরত্ব তৈরি করেছিল,আমলাতন্ত্রের একটি অংশের বিরাগও ডেকে এনেছিল।

এর সঙ্গে যুক্ত ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা—যেখানে তাকে ‘ম্যানারলেস’ হিসেবে উপস্থাপন করার নিরন্তর চেষ্টা চলেছে।তবে দেশে ফিরে খালি পায়ে মাটিতে পা রাখার মুহূর্তেই সেই প্রোপাগান্ডার বড় অংশই কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ নির্বাসন তাকে শিখিয়েছে—বিনয়ী হতে নয় শুধু,বিনয় প্রকাশ করতে।বস্তুগত জৌলুসের প্রতি তার অনাগ্রহ,সাধারণ চেয়ারে বসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ,অতীতের রুঢ় আচরণের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া,নিরাপত্তা কর্মী ও বাসচালকের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ—এসব ছোট ঘটনা বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।এগুলো কৃত্রিম রাজনৈতিক প্রদর্শনী নয়;বরং দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা আত্মসংযমের বহিঃপ্রকাশ।

তবে এই বিনয়কে দুর্বলতা ভাবার সুযোগ নেই।তার বক্তব্য ও আচরণে একটি বার্তা স্পষ্ট—তিনি নম্র,কিন্তু সিদ্ধান্তে কঠোর। শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির প্রশ্নে তিনি আপসহীন থাকবেন—এমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভেতরে সুবিধাবাদ,তেলবাজি ও দুর্নীতিতে অভ্যস্তদের জন্য সতর্কবার্তাও সুস্পষ্ট।
তারেক রহমান ২.০–এর রাজনীতিতে তোষামোদির কোনো মূল্য নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতি যদি সত্যিই নতুন পথে যেতে চায়, তবে এই বিনয়ী কিন্তু দৃঢ় রাজনৈতিক ভাষা কতটা বাস্তব রূপ পায়—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আরও খবর

Sponsered content