প্রতিনিধি ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৪:২৭:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামী লীগ একটি প্রভাবশালী ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক শক্তি।স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা,উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করেছে।এই রিপোর্টে রাজনৈতিক,সামাজিক,অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা—এই পাঁচটি প্রধান সূচকে আওয়ামী লীগের অবদান বিশ্লেষণ করা হলো।

১. রাজনৈতিক অবদান
স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রগঠন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্ব দেয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন করে।
গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা: একাধিকবার সাংবিধানিক সরকার পরিচালনার মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা।
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান: সংসদীয় ব্যবস্থা কার্যকর রাখা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ।
নারী নেতৃত্ব: শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে গণ্য,যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
২. সামাজিক উন্নয়ন
দারিদ্র্য হ্রাস: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা,প্রতিবন্ধী ভাতা) সম্প্রসারণ।
শিক্ষা বিস্তার: প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলককরণ,বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ,মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি।
স্বাস্থ্য খাত: কমিউনিটি ক্লিনিক,মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ,টিকাদান কর্মসূচি।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি: ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণার মাধ্যমে ই-সেবা, অনলাইন শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তার।
৩. অর্থনৈতিক অবদান
স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি: ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং মাথাপিছু আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
অবকাঠামো উন্নয়ন: পদ্মা সেতু,মেট্রোরেল,এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি।
শিল্প ও রপ্তানি: তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ,রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ,বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল।
দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান: সামাজিক কর্মসূচি ও অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা
কূটনৈতিক ভারসাম্য: ভারত,চীন,যুক্তরাষ্ট্র,ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক।
শান্তিরক্ষা মিশন: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ,আন্তর্জাতিক সুনাম বৃদ্ধি।
সন্ত্রাসবাদ দমন: জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
রোহিঙ্গা সংকট: মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন।
৫. আইন ও শৃঙ্খলা
জঙ্গিবাদ দমন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা সমন্বয়।
ডিজিটাল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ: সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইন ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি।
নারী ও শিশু সুরক্ষা: নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনগত কাঠামো জোরদার।
সামগ্রিক নিরাপত্তা: বড় ধরনের সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য।
৬. কঠোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ: আওয়ামী লীগ বনাম অন্যান্য শাসনামল
এই অংশে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় আওয়ামী লীগ (বিশেষত শেখ হাসিনার শাসনকাল) এবং অন্যান্য শাসনামল—সামরিক শাসন,তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার—এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরা হলো।
ক) রাজনৈতিক শাসন ও রাষ্ট্রদর্শন
আওয়ামী লীগ: রাষ্ট্রের মূল দর্শন হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা জোরদার। স্বাধীনতার চেতনা রাষ্ট্রীয় নীতিতে সংযুক্ত।
অন্যান্য শাসনামল: সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনে সংবিধান স্থগিত/বিকৃত হয়েছে; বিএনপি আমলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা ও যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা যায়।
মূল পার্থক্য: আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় আদর্শে স্পষ্ট,অন্য শাসনামলে আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও আপস প্রবল।
খ) অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা
আওয়ামী লীগ: ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি,অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্প,দারিদ্র্য হ্রাস ও মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতি।
অন্যান্য শাসনামল: বিএনপি আমলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম,অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি; সামরিক শাসনে উন্নয়ন ছিল সীমিত ও কেন্দ্রভিত্তিক।
মূল পার্থক্য: আওয়ামী লীগ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জোর দিয়েছে,অন্যরা ছিল স্বল্পমেয়াদি ও রাজনৈতিক বিবেচনানির্ভর।
গ) সামাজিক অগ্রগতি
আওয়ামী লীগ: নারী শিক্ষা,সামাজিক নিরাপত্তা,স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ।
অন্যান্য শাসনামল: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সীমিত; নারী ক্ষমতায়নে কাঠামোগত অগ্রগতি কম।
মূল পার্থক্য: আওয়ামী লীগ সামাজিক খাতে রাষ্ট্রকে সক্রিয় করেছে,অন্য শাসনামলে এটি গৌণ ছিল।
ঘ) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা
আওয়ামী লীগ: ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি,জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’,জাতিসংঘে সক্রিয় ভূমিকা।
অন্যান্য শাসনামল: জঙ্গিবাদ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ; কূটনীতিতে একমুখী নির্ভরতা।
মূল পার্থক্য: আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক আস্থার জায়গা তৈরি করেছে,অন্য শাসনামলে বাংলাদেশ প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে।
—
ঙ) আইন ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
আওয়ামী লীগ: জঙ্গিবাদ ও সংগঠিত সহিংসতা দমন, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি।
অন্যান্য শাসনামল: সিরিজ বোমা হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দৃশ্যমান।
মূল পার্থক্য: আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক করেছে, অন্য শাসনামলে নিরাপত্তা ছিল প্রতিক্রিয়াশীল।
—
চূড়ান্ত মূল্যায়ন
কঠোর তুলনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগ বিশেষত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে একটি কার্যকর, উন্নয়নমুখী ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রে রূপান্তরের চেষ্টা করেছে। অন্য শাসনামলে রাষ্ট্র পরিচালনায় আদর্শিক অস্পষ্টতা, নিরাপত্তাহীনতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতার ঘাটতি স্পষ্ট। সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও, রাষ্ট্র নির্মাণের সূচকে আওয়ামী লীগের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী।
















