অপরাধ-আইন-আদালত

৩ বছরেও ন্যায়বিচার নেই: মঠবাড়িয়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ

  প্রতিনিধি ৩ জানুয়ারি ২০২৬ , ৩:১১:৩১ প্রিন্ট সংস্করণ

৩ বছরেও ন্যায়বিচার নেই: মঠবাড়িয়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ

প্রতারণার অভিযোগ করতে গিয়ে ভিকটিম,এখন নিজেই অভিযুক্ত—পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি,ঘুষ,প্রমাণ গোপন ও হত্যাচেষ্টার বিস্ফোরক অভিযোগ

পিরোজপুর প্রতিনিধি।।প্রতারকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে উল্টো জীবন-মরণ সংকটে পড়েছেন এক কলেজছাত্রী।তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ন্যায়বিচার পাননি ভিকটিম সালমা আক্তার (ছদ্মনাম নয়)।বরং অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভিকটিম ও তার পরিবারকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেল-জুলুম ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চলেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের সূত্রপাত

সালমা আক্তার পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা এবং একটি ডিগ্রি কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।তিনি জানান,তাকে ও তার ভাইকে সৌদি আরবে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে একটি প্রতারকচক্র ৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে।এ টাকা উদ্ধারের জন্য ২০২২ সালের ২৫ মে তিনি মঠবাড়িয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

থানায় অভিযোগ,কক্ষে ডেকে কু-প্রস্তাব

ভিকটিমের ভাষ্যমতে,অভিযোগ গ্রহণের পর তৎকালীন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল ইসলাম বাদল তাকে থানার একটি কক্ষে ডেকে নিয়ে অভিযোগের কাগজ হাতে দিয়ে নানান প্রলোভন দেখান এবং কু-প্রস্তাব দেন।তিনি শারীরিকভাবে স্পর্শেরও চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ।এতে আতঙ্কিত হয়ে তিনি থানা ত্যাগ করেন।

অভিযোগ চাপা,প্রমাণ জব্দ

পরবর্তীতে এএসআই ফিরোজ আলম ভিকটিমের কাছ থেকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ দলিল,স্ট্যাম্প ও লিগ্যাল নোটিশ গ্রহণ করেন।অভিযোগ রয়েছে,থানার মধ্যেই আসামিদের সঙ্গে অবৈধ সমঝোতার চেষ্টা করা হয়।এক পর্যায়ে মূল প্রতারণার অভিযোগ চাপা রেখে ভিকটিমকে দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিযোগ লিখিয়ে নেওয়া হয়।

ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে হত্যাচেষ্টা

যৌন হয়রানির ভয়ে থানায় না গিয়ে সালমা জেলা পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর তাকে থানায় ডাকা হলে,সেখান থেকে ফেরার পথে আসামি ও তাদের সহযোগীরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।

এ ঘটনায় তার পিতা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করলেও অভিযোগ রয়েছে—ওসি নুরুল ইসলাম বাদল দীর্ঘদিন মামলা এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করেননি।প্রায় তিন মাস পর ২০২২ সালের ৯ ডিসেম্বর মামলা রেকর্ড করা হয়।

তদন্তেও ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ

মামলার তদন্তভার পান এসআই আবুল কাসেম।ভিকটিমের অভিযোগ,তিনি তার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেন এবং আসামির পাসপোর্ট ইমিগ্রেশনে পাঠানোর আশ্বাস দেন।পরে জানা যায়,তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে নারী ও শিশু আদালতের মামলা নং ৯৬/২২-এর প্রতিবেদন আটকে রাখেন এবং প্রধান আসামিকে গোপনে বিদেশে পালাতে সহায়তা করেন।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—ভিকটিমের ব্যক্তিগত ৯টি ছবি আদালতে দাখিল না করে তদন্ত কর্মকর্তা নিজের কাছে রেখে নিয়মিত ব্ল্যাকমেইল করে আসছেন।

তিন বছরেও বিচার নেই,বরং হয়রানি

ঘটনার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা থাকলেও তারা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন।ভিকটিম ও তার পরিবারকে একাধিক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।সালমা একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

আইনি বিশ্লেষণ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,অভিযোগগুলো সত্য হলে দণ্ডবিধির ৩৫৪ (শ্লীলতাহানি),৪২০ (প্রতারণা),৩২৬/৩০৭ (হত্যাচেষ্টা), ২১৭-২১৮ (সরকারি কর্মচারীর কর্তব্যে অবহেলা),নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের একাধিক ধারা প্রযোজ্য।

মানবাধিকার প্রশ্নে উদ্বেগ

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন,পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে এটি শুধু একটি পরিবারের নয়,পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

প্রশাসনের বক্তব্য

এ বিষয়ে মঠবাড়িয়া থানার বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ভিকটিমের দাবি

সালমা আক্তারের একটাই দাবি—তার আত্মসাৎ হওয়া টাকা ও দলিল ফেরত,অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার ও বরখাস্ত এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আরও খবর

Sponsered content