মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা ও জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদন নতুন করে এক গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে রাষ্ট্র,রাজনীতি এবং বিচারব্যবস্থাকে। প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা,ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং সম্ভাব্য দায়ীদের বিষয়ে আংশিক তথ্য প্রকাশ পেলেও পূর্ণাঙ্গ সত্য এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে।আর এই অসম্পূর্ণতা থেকেই জন্ম নিয়েছে সন্দেহ,বিতর্ক এবং অবিশ্বাস।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১,৪০০ জন নিহতের মধ্যে ৬৬ শতাংশ মানুষ ৭.৬২ মিলিমিটার মিলিটারি গ্রেড বুলেটে নিহত হয়েছেন।এটি কোনো সাধারণ তথ্য নয়।এই ধরনের গুলি সাধারণ নাগরিকের হাতে থাকার কথা নয়; এটি মূলত সামরিক বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত।ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে—এই অস্ত্র কারা ব্যবহার করেছে? কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়েছে? আদেশদাতা কে ছিলেন?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কোনো তদন্তই বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।
সরকারি হিসাবে নিহতদের মধ্যে ৮৪৬ জন ছাত্র ও সাধারণ জনগণ বলে উল্লেখ থাকলেও বাকি শত শত মানুষের পরিচয় অস্পষ্ট।তারা কি রাজনৈতিক কর্মী,নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, নাকি সম্পূর্ণ নিরীহ পথচারী?রাষ্ট্র যদি নিহতদের পরিচয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়,তবে পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা হয়—মানুষ নয়।আর মানুষহীন পরিসংখ্যান বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো শর্টগান ও পিস্তলের গুলিতে নিহতদের প্রসঙ্গ।কারা এই অস্ত্র ব্যবহার করেছে,কোন পক্ষ থেকে গুলি চালানো হয়েছে,কিংবা সংঘর্ষের প্রকৃতি কী ছিল—এসব বিষয়ে প্রতিবেদনের নীরবতা প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।একইভাবে ২০ শতাংশ নিহত “অন্যান্য সহিংসতায়” মারা গেছেন বলা হলেও সেই সহিংসতার প্রকৃতি ব্যাখ্যা না থাকায় সত্যের জায়গায় অনুমানই জায়গা করে নিচ্ছে।
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সংগঠন ও পুলিশের কিছু সদস্যের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হলেও নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য গোপন রাখা হতে পারে—কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দায় নির্ধারণে অস্পষ্টতা ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।অপরাধী যদি পরিচয়হীন থাকে,তবে বিচারও হয়ে পড়ে বিমূর্ত।
আরেকদিকে,দেশে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়েও উদ্বেগ কম নয়।হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী,পেশাজীবী ও পুলিশ সদস্যকে আসামি করার অভিযোগ উঠেছে।যদি সত্যিই নির্বিচারে মামলা হয়ে থাকে,তবে সেটিও মানবাধিকার লঙ্ঘন। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি ও তদন্ত পুনর্বিবেচনার সুপারিশের বিষয়টি তাই গুরুত্বসহকারে দেখা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি সত্য জানতে চায়,নাকি রাজনৈতিক সুবিধাজনক সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়?কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে,আংশিক সত্য শেষ পর্যন্ত সমাজকে আরও বিভক্ত করে।বিচার তখন প্রতিশোধে পরিণত হয়, আর আইনের শাসন হয়ে পড়ে রাজনৈতিক অস্ত্র।
আজ প্রয়োজন একটিই—পূর্ণাঙ্গ,নিরপেক্ষ এবং প্রকাশ্য তদন্ত। নিহত প্রত্যেক মানুষের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে,ব্যবহৃত অস্ত্রের উৎস নির্ধারণ করতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তি যে পক্ষেরই হোক,আইনের আওতায় আনতে হবে।রাষ্ট্রের দায়িত্ব সত্যকে আড়াল করা নয়; বরং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা।
স্বচ্ছতা ছাড়া শান্তি আসে না,আর জবাবদিহিতা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে না।জাতিসংঘের প্রতিবেদন বিতর্কের সূচনা করেছে—এখন দায়িত্ব সরকারের,এই বিতর্কের ইতি টেনে জাতির সামনে সত্য তুলে ধরার।
Jb buttons
![]()














সর্বশেষ সংবাদ :———