প্রতিনিধি ১০ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:৩০:১১ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল দেশের অন্যতম সাইবার বুলিংয়ের শিকার—এ কথা এখন আর গোপন নয়।ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার আইনের অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিকে নয়,রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে গভীর সংকটে ফেলেছিল।আইসিটি আইন বাতিলের উদ্যোগে সরকারকে ধন্যবাদ জানালেও বাস্তবতা হলো—আইন বাতিলের ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে সাংবাদিক হয়রানি বন্ধ হয়নি।

বিশেষ করে জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির তথ্য দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।এটি শুধু হাস্যকর নয়,বরং নিন্দনীয় ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের নগ্ন উদাহরণ।
কালো আইনের ঢাল হয়ে উঠেছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার আইন ছিল অপরাধীদের রক্ষাকবচ।দুর্নীতিবাজ, মাদক কারবারি,রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও প্রশাসনের অসাধু অংশ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এসব আইন ব্যবহার করে সংবাদ বন্ধের চেষ্টা চালিয়েছে।
বরিশালের হাতেম চৌমাথার বাজারে কথিত ছাত্রলীগ নেতা যুবায়েরের বিরুদ্ধে অবৈধ মিটারের মাধ্যমে ৩ শতাধিক কাঁচামাল ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় একাধিক সাংবাদিক ও প্রকাশককে সাইবার আইনে মামলার মুখোমুখি হতে হয়।
বরিশাল ক্রাইম নিউজের রনির দেওয়া তথ্য ও লিংক ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ করায়—
যুগান্তরবার্তার বরিশাল প্রতিনিধি
রিপোর্টার্স ইউনিটের যুগ্ম সম্পাদক
এমনকি প্রকাশক-সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদক পর্যন্ত
সাইবার আইনে মামলার আসামি হন—যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
সংবাদ করলেই উকিল নোটিশ,মামলার হুমকি
বরিশাল মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ হুমায়ুন কবির চাঁনমারীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে—
জাতীয় জনকণ্ঠ পত্রিকার সাংবাদিক
দখিনের বার্তার প্রকাশক-সম্পাদক
দৈনিক আজকের সময়
যুগান্তরবার্তা ও ডিজিটাল বিডিনিউজের প্রকাশক-সম্পাদক
এর বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ পাঠানো হয় সাবেক এপিপি মোঃ ইশতিয়াক আহমেদ রকির মাধ্যমে।
এছাড়া খুলনার সরকারি কলেজের এক ছাত্রীকে বিনা খরচে ভর্তি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তির ব্যবস্থা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়ায় সাংবাদিককে সাইবার আইনে মামলার হুমকি দেওয়া হয়—যা মানবিক সহায়তাকেও অপরাধে রূপান্তরের নজির।
যৌন হয়রানি সংবাদে সাইবার মামলার ভয়
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানার সাবেক ওসি নুরুল ইসলাম বাদলের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সাংবাদিককে সাইবার আইনে মামলার হুমকি দেওয়া হয়।এমনকি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মামলা সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দিতেও সাংবাদিকদের ভয় দেখানো হয়েছে।
আইন ও সংবিধানের আলোকে বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ সংবিধান
অনুচ্ছেদ ৩৯(১ ও ২):
চিন্তা,বিবেক ও বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত।
অনুচ্ছেদ ২৭:
আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান।
সাইবার আইনের অপব্যবহার এই মৌলিক অধিকারগুলোকে সরাসরি লঙ্ঘন করেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার
বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী—
ICCPR (International Covenant on Civil and Political Rights)
Article 19: মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতের বাধ্যবাধকতা।
রাজনৈতিক,সামাজিক ও নিরাপত্তা প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা,প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অপরাধী চক্রের স্বার্থ রক্ষায় সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করা হলে—
গণতন্ত্র দুর্বল হয়
দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়
আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়
জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে
কারণ স্বাধীন সংবাদমাধ্যমই রাষ্ট্রের প্রথম নিরাপত্তা বেষ্টনী।
সরকারের অবস্থান ও করণীয় (কঠোর ভাষায়)
১. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সব হয়রানিমূলক সাইবার মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে
২. ২৬৬ সাংবাদিকের মামলার তালিকা প্রকাশ করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত
৩. সাইবার ও ডিজিটাল আইনকে সংবিধানসম্মত ও সাংবাদিকবান্ধব করে পুনর্গঠন
৪. সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা আইন ও হটলাইন ব্যবস্থা
৫. মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
উপসংহার
সাংবাদিক নিপীড়ন মানে কেবল একজন সাংবাদিককে চুপ করানো নয়—এটি জনগণের জানার অধিকার কেড়ে নেওয়া। সাইবার আইনের নামে সংবাদ দমন চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে নীরব,অন্ধ ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র।
গণতন্ত্র বাঁচাতে হলে সাংবাদিককে বাঁচাতে হবে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া রাষ্ট্র নিরাপদ নয়।
















