জাতীয়

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নাকি বৈধতার সংকট? বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ

  প্রতিনিধি ৩ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:৩৯:৪২ প্রিন্ট সংস্করণ

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নাকি বৈধতার সংকট? বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ

ডেস্ক রিপোর্ট।।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো সরকারিভাবে ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নির্বাচন’ হিসেবে উপস্থাপিত হলেও বাস্তব প্রেক্ষাপট,অংশগ্রহণের মাত্রা এবং প্রশাসনিক ভূমিকা ঘিরে ক্রমেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এবং প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের নির্বাচন—এই চারটি ধাপ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে একটি গভীর বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি করেছে।

আইনি বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭, ১১, ৫৬ ও ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নির্বাচনকে সাংবিধানিকভাবে অবৈধ না করলেও এর গণতান্ত্রিক বৈধতা (Democratic Legitimacy) প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনে সবদল অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচনের আগের রাতের ভোট,প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও ফলাফল ব্যবস্থাপনার অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করে।

সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।সরকার সাংবিধানিকভাবে স্থগিত বা রহিত না থাকা সত্ত্বেও একটি সাংবিধানিক ভিত্তিহীন সরকারের প্রজ্ঞাপনে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ সংবিধানের ক্ষমতা বিভাজন ও নির্বাহী কর্তৃত্বের সীমা লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

একতরফা বা আংশিক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ক্রমশ একদলীয় কর্তৃত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।সংসদ কার্যত বিরোধী কণ্ঠশূন্য হয়ে পড়ায় রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।বিরোধী দলগুলোর বাইরে থাকা নির্বাচন সরকারকে স্বল্পমেয়াদে ক্ষমতায় রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল করে।

সামাজিক বিশ্লেষণ

নির্বাচনকেন্দ্রিক আস্থাহীনতা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোটবিমুখতা বাড়িয়েছে।তরুণ ভোটারদের বড় অংশ নির্বাচনকে ‘অকার্যকর আনুষ্ঠানিকতা’ হিসেবে দেখছে।ফলে সামাজিকভাবে গণতন্ত্র একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থার বদলে ক্ষমতা রক্ষার যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ

নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার,মামলা ও নজরদারি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করেছে।আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন নিরপেক্ষতা হারায়,তখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে রাজনৈতিক নিরাপত্তা একাকার হয়ে পড়ে—যা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

নির্বাচনের বৈধতা সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে,বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানে কড়াকড়ি বাড়ছে।নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা,কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্র,ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ বরাবরই অংশগ্রহণমূলক,অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ কূটনৈতিক চাপ ও পর্যবেক্ষণের মুখে পড়ে। ২০২৬ সালের নির্বাচন যদি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়,তবে নিষেধাজ্ঞা,ভিসা নীতি এবং বাণিজ্য সুবিধা হ্রাসের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

উপসংহার

বাংলাদেশের নির্বাচন আজ আর কেবল ভোটের আয়োজন নয়—এটি সংবিধান,রাষ্ট্রের বৈধতা,সামাজিক আস্থা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের একটি সম্মিলিত পরীক্ষা।সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তি দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হলেও,অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা ছাড়া নির্বাচন রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল নয়,বরং আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে হলে নির্বাচনকে কেবল সাংবিধানিক নয়,রাজনৈতিক,সামাজিক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার বিকল্প নেই।

আরও খবর

Sponsered content