সম্পাদকীয়

সাংবাদিককে কেন আইন জানতে হয়

  প্রতিনিধি ৩ জানুয়ারি ২০২৬ , ৩:২৮:২৯ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।আইন সম্পর্কে সাংবাদিকদের ধারণা থাকা কেন জরুরি—এটি বোঝাতে একটি মজার কিন্তু শিক্ষণীয় উদাহরণ দিয়েই শুরু করা যায়।আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘ইন্নোয়েন্ডো’ (Innuendo)। ইন্নোয়েন্ডো এমন এক ধরনের বক্তব্য,যা উপরিতলে নিরীহ বা অমানহানিকর মনে হলেও অন্তর্নিহিত অর্থে তা মানহানিকর হতে পারে। অর্থাৎ,সরাসরি কিছু বলা হয়নি,কিন্তু ইঙ্গিতে এমন অর্থ তৈরি হয়েছে,যা কারও সম্মান ক্ষুণ্ন করে।

ইন্নোয়েন্ডো ও ক্যাসিডি বনাম ডেইলি মিরর মামলা

এই ধারণাটি বোঝার জন্য বহুল আলোচিত ‘ক্যাসিডি বনাম ডেইলি মিরর’ (১৯২৯) মামলাটি উল্লেখযোগ্য। ব্রিটেনের জনপ্রিয় দৈনিক ডেইলি মিরর–এ “Today’s Gossip” শিরোনামের একটি কলামে মেক্সিকান সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল ক্যাসিডি ও এক নারীর ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল—তারা শিগগিরই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছেন।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।ওই নারী ছিলেন ক্যাসিডির আইনগত স্ত্রী; তারা আগেই বিবাহিত।ছবিটি প্রকাশের পর সমাজে আলোচনা শুরু হলে ক্যাসিডির স্ত্রী মানহানির মামলা করেন। তার অভিযোগ ছিল—এই ক্যাপশনের ফলে পরিচিতজনদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে,এতদিন তিনি ক্যাসিডির সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে বসবাস করছিলেন।

মামলার এজাহারে তিনি ‘ইন্নোয়েন্ডো’–এর যুক্তি তুলে ধরে বলেন,সংবাদটি সরাসরি কিছু না বললেও সাধারণ মানুষ এমন অর্থই বুঝেছে,যা তার সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন করেছে। আদালত তার যুক্তি গ্রহণ করেন এবং ডেইলি মিরর–কে ৫০০ পাউন্ড জরিমানা করেন—যা সেই সময়ের হিসেবে বড় অঙ্কের শাস্তি ছিল।

এই মামলাই প্রমাণ করে,সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে শব্দচয়ন ও উপস্থাপনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং আইন না জানলে কীভাবে অজান্তেই বড় আইনি ঝুঁকিতে পড়তে হয়।

তবে কি সাংবাদিকরা সবসময় মানহানির ঝুঁকিতে?

বাস্তবে,সব মানহানি মামলাই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে টেকে না। আইনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা (defence) রয়েছে, যেগুলো জানা ও প্রয়োগ করা সাংবাদিকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

১. সত্যতা ও জনস্বার্থ

যদি অভিযুক্ত সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রমাণ করতে পারে যে—

প্রকাশিত তথ্য সত্য, এবং

সেটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হয়েছে,

তাহলে সেটি মানহানি হিসেবে গণ্য হবে না।এখানে শুধু সত্য বললেই যথেষ্ট নয়; আদালতে দেখাতে হয়,বিষয়টি জনগণের জানার অধিকারভুক্ত ছিল।

২. সৎ বিশ্বাসে মতামত প্রকাশ

জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে (যেমন—সরকারি কর্মকর্তার আচরণ, জনপ্রতিনিধির ভূমিকা,কোনো বই বা চলচ্চিত্রের সমালোচনা) সৎ বিশ্বাসে মতামত প্রকাশ করলে সেটিও মানহানি নয়।তবে এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় প্রমাণ করা জরুরি—

এটি মতামত, থ্য নয়;

মতামতটি জনস্বার্থের বিষয়ে ছিল;

মতামতটি সত্য তথ্যের ভিত্তিতে গঠিত;

যেকোনো যুক্তিসঙ্গত মানুষ এমন মতামত পোষণ করতে পারেন।

তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন ও মানহানি

আমাদের দেশে প্রায়ই তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভিত্তিহীন,অতিরঞ্জিত কিংবা আজগুবি লেখা প্রকাশিত হয়। এগুলোর বেশিরভাগই স্পষ্টভাবে মানহানিকর।তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গুজব মানুষের কৌতূহলের বিষয় হতে পারে,কিন্তু তা সাধারণত ‘জনস্বার্থ’ নয়।

আদালত জনস্বার্থের প্রশ্নে অত্যন্ত কঠোর।কেবল পাঠকের আগ্রহ বা ক্লিক বাড়ানোর উদ্দেশ্য আইনি সুরক্ষা দেয় না।

সাংবাদিকতার আরেকটি বড় ঝুঁকি: প্রমাণের ভার

মানহানি আইনের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘প্রমাণের ভার’। ঐতিহাসিকভাবে,মানহানি মামলায় সাধারণত বিবাদীকেই—অর্থাৎ গণমাধ্যমকে—প্রমাণ করতে হয় যে তাদের প্রকাশিত বক্তব্য সত্য ছিল।

এটি গণমাধ্যমের জন্য বড় চাপ সৃষ্টি করে। কারণ অনেক সময়—

সংবাদের উৎস প্রকাশ করা সম্ভব হয় না,

বা পর্যাপ্ত প্রামাণ্য দলিল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

উপসংহার

এই বাস্তবতাগুলোই প্রমাণ করে—সাংবাদিকতা কেবল লেখালেখি বা খবর সংগ্রহের পেশা নয়; এটি গভীরভাবে আইনসংলগ্ন একটি দায়িত্ব। আইন না জানলে সাংবাদিকতা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে,আর আইন জানলে সাংবাদিকতা হয় আরও দায়িত্বশীল, সাহসী ও জনস্বার্থমুখী।

আরও খবর

Sponsered content