নিজস্ব প্রতিবেদক।।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে।তবে ইতিহাস বলছে,বাংলাদেশের সংসদের উদ্বোধনী দিনে এমন ঘটনা নতুন নয়।স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সংসদের প্রথম দিনেই বাগ্বিতণ্ডা,ওয়াকআউট,শপথ বর্জন,এমনকি অধিবেশন বর্জনের মতো ঘটনা ঘটেছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গঠিত গণপরিষদ থেকে শুরু করে গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ পর্যন্ত উদ্বোধনী অধিবেশন ঘিরে বহু নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে।এর মধ্যে রয়েছে সংসদ কক্ষে ধূমপান, শপথ না দিয়ে সদস্যদের দাঁড়িয়ে থাকা,উন্মুক্ত অধিবেশন আয়োজন,সাংবাদিকদের বর্জনসহ নানা ঘটনা।
গণপরিষদে লুঙ্গি পরে অধিবেশন
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আইনসভা গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হয় ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল।ওই অধিবেশনে নোয়াখালীর সদস্য খাজা আহমদ লুঙ্গি-শার্ট পরে অংশ নেন,যা সে সময় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।অধিবেশন কক্ষে ধূমপানের ঘটনাও ঘটে। মাইক সংকট এবং স্পিকারের হাতুড়ি না থাকার মতো ঘটনাও সেদিনের অধিবেশনে দেখা যায়।
দ্বিতীয় সংসদে শপথ বর্জন
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়।বিরোধী দলের ৫৩ জন সদস্য অস্থায়ী স্পিকারকে ‘নিযুক্ত’ উল্লেখ করে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান।পরে তুমুল হট্টগোলের মধ্যেই অধিবেশন পরিচালিত হয়।
সামরিক আমলে সংসদের বাইরে ‘উন্মুক্ত অধিবেশন’
১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল সংসদ ভবনের বাইরে ‘উন্মুক্ত সংসদ’ পরিচালনা করে।একই সময় বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে রাজপথে আন্দোলন চালায়।
সাংবাদিকদের বর্জন
১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন সাংবাদিকেরা বর্জন করেন।সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে সংবাদকর্মীরা অধিবেশন কাভারেজ থেকে বিরত থাকেন।
নব্বইয়ের পর রাজনৈতিক দ্বৈরথ
১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ থেকে শুরু হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।সংসদ নেতা খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার দ্বৈরথ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে “ব্যাটলিং বেগমস” নামে পরিচিতি পায়।
‘বুড়ো আঙুল’ বিতর্ক
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রবের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের সদস্যদের ‘বুড়ো আঙুল’ দেখানোর অভিযোগ নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
নির্বাচন বর্জন ও বিতর্ক
২০০১ সালের অষ্টম সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি।২০০৯ সালের নবম সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে বিএনপি ওয়াকআউট করে।
বিতর্কিত নির্বাচন ও সংসদ
২০১৪ সালের দশম সংসদ এবং ২০১৯ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই যাত্রা শুরু করে।বিএনপিসহ প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় সংসদে কার্যত শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতি দেখা যায়।
সাত মাসেই শেষ দ্বাদশ সংসদ
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘ডামি নির্বাচন’ নামে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।নির্বাচনের মাত্র সাত মাসের মাথায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।
নতুন সংসদেও উত্তাপ
দুই বছর ছয় দিনের বিরতির পর এবার শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।উদ্বোধনী অধিবেশনেই বিরোধী দলের প্রতিবাদ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আবারও সংসদীয় রাজনীতির উত্তাপ সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে উদ্বোধনী অধিবেশনগুলো প্রায়ই দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।তাই নতুন সংসদের যাত্রাও সেই ধারার ব্যতিক্রম নয়।
![]()

















































সর্বশেষ সংবাদ :———