মাজহারুল ইসলাম।।১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত গণভোটের ফলাফল প্রথম দৃষ্টিতে একটি স্পষ্ট বিজয়ের ছবি তুলে ধরলেও সংখ্যাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আসে।কাগজে-কলমে “হ্যাঁ” জয়ী হলেও গণতান্ত্রিক বৈধতার প্রশ্নে এই ফলাফল গুরুতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সংখ্যা যা বলে,বাস্তবতা যা দেখায়
দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি।কিন্তু গণভোটে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৬০.২৬% ভোটার।অর্থাৎ প্রায় ৪০% ভোটার সরাসরি অংশই নেননি।গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এত বড় অংশের নীরবতা নিজেই একটি রাজনৈতিক বার্তা।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো —
৪ কোটি ৮০ লাখের কিছু বেশি ভোট “হ্যাঁ” পেলেও এটি মোট ভোটারের মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।অর্থাৎ দেশের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার সরাসরি এই সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেননি।ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সম্মতি পাওয়া গেছে — এমন দাবি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হলেও গণতান্ত্রিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
না ভোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য
গণভোটে প্রায় ৩২% ভোটার সরাসরি “না” বলেছেন।উপস্থিত ভোটারের মধ্যে তিন ভাগের এক ভাগের স্পষ্ট আপত্তি কোনো ছোট বিষয় নয়।সাংবিধানিক পরিবর্তনের মতো মৌলিক সিদ্ধান্তে এত বড় বিরোধিতা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ঘাটতি নির্দেশ করে।
সংবিধান সংশোধন বা জাতীয় সনদের মতো কাঠামোগত সিদ্ধান্ত সাধারণ নির্বাচনের মতো নয়; এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য।
রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভয়ভীতির প্রশ্ন
রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি বড় দল নিষিদ্ধ বা কার্যত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে ভোটের আচরণ স্বাভাবিক থাকে কি না — এ প্রশ্ন অনিবার্য।অভিযোগ রয়েছে,বহু ভোটার নিরাপত্তা, মামলা বা রাজনৈতিক চাপ এড়াতে কৌশলগত ভোট দিয়েছেন। যদি ভোটাররা স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয়ে ভোট দিতে না পারেন, তবে সেই ফলাফল গণতান্ত্রিক ইচ্ছার প্রকৃত প্রতিফলন নয়।
গণভোট তখনই অর্থবহ হয়,যখন সব রাজনৈতিক মত সমানভাবে প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়।
সাংবিধানিক বৈধতা বনাম নৈতিক বৈধতা
আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশন ফলাফল ঘোষণা করলেই একটি প্রক্রিয়া বৈধ হয়ে যায় — কিন্তু সাংবিধানিক রাজনীতিতে “আইনি বৈধতা” ও “নৈতিক বৈধতা” এক জিনিস নয়।
একটি জাতীয় সনদ তখনই শক্তিশালী হয় যখন—
বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকে,
বিরোধী মতামত অংশ নিতে পারে,
জনগণের স্পষ্ট ও নিরঙ্কুশ সমর্থন পাওয়া যায়।
এই তিনটির কোনোটিই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে ভবিষ্যতে সেই কাঠামো রাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
বিতর্কিত গণভোট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে—
নীতিনির্ধারণ অনিশ্চিত হয়,
বিদেশি বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে,
উন্নয়ন সহযোগীরা সতর্ক অবস্থান নেয়।
রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপরই নির্ভর করে।
নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার ঝুঁকি
যদি জনগণের বড় অংশ মনে করে রাষ্ট্রীয় কাঠামো তাদের সম্মতি ছাড়া চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে সামাজিক মেরুকরণ বাড়ে। এর ফল হয় —
রাজনৈতিক সংঘাত,
বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ,
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা।
ইতিহাস বলছে, বিতর্কিত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত কখনো দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনে না।
শেষ কথা
সংখ্যাগতভাবে “হ্যাঁ” জয়ী হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই গণভোট একটি বিভক্ত ম্যান্ডেটের প্রতিচ্ছবি।মোট ভোটারের বড় অংশের নীরবতা,উল্লেখযোগ্য “না” ভোট, এবং অসম রাজনৈতিক পরিবেশ — সব মিলিয়ে “জুলাই জাতীয় সনদ”কে নিঃসন্দেহ জনসমর্থনের দলিল বলা কঠিন।
রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি হওয়া উচিত বিজয় ঘোষণা নয়, বরং আস্থার পুনর্গঠন। কারণ সংবিধান কেবল ক্ষমতাসীনদের দলিল নয় — এটি পুরো জাতির সামাজিক চুক্তি।
















































সর্বশেষ সংবাদ :———