নিজস্ব প্রতিবেদক।।অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ।গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ চুক্তিকে ঘিরে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নানা প্রশ্ন উঠেছে।সমালোচকদের মতে,সামান্য শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে এতে বাংলাদেশের ওপর বিস্তৃত শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) প্রকাশিত ৩২ পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র অনুযায়ী,বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার পণ্য শুল্কমুক্ত বা বিশেষ সুবিধায় মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি মার্কিন পণ্যে সমপর্যায়ের সুবিধা দেবে।এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক,চিকিৎসা সরঞ্জাম,আইসিটি পণ্য,গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন শিল্পসামগ্রী।
প্রতিরক্ষা ও জ্বালানিতে বাড়তি অঙ্গীকার
চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে,বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বেশি সামরিক সরঞ্জাম কেনার চেষ্টা করবে।একই সঙ্গে ‘নন-মার্কেট দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত রাষ্ট্রগুলোর (যুক্তরাষ্ট্রের সংজ্ঞায় চীন ও রাশিয়া) সঙ্গে ভবিষ্যতে মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করলে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে পুনরায় শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
পারমাণবিক খাতেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশকে তাদের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে,সেসব দেশ থেকে বাংলাদেশ পারমাণবিক চুল্লি,জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না।এতে ভবিষ্যতে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘ম্যানেজড ট্রেড’ ব্যবস্থার অভিযোগ
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে সম্মত হয়েছে।এছাড়া রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে। কৃষিখাতে অন্তত ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির অঙ্গীকারও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা একে ‘নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য’ বা ম্যানেজড ট্রেডের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন,যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
শ্রম ও ডিজিটাল শর্ত
চুক্তি অনুযায়ী,বাংলাদেশকে ধর্মঘটের ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে এবং ট্রেড ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য জরিমানা বাড়াতে হবে।দুই বছরের মধ্যে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) সাধারণ শ্রম আইনের আওতায় আনতে হবে।
ডিজিটাল খাতে বন্দর ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় এমন সাইবার-নিরাপদ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে,যাতে ‘অন্য বিদেশি সরকার’ তথ্য না পায়।পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি প্রশাসন বিধিমালা (ইএআর) অনুযায়ী পণ্যের পুনঃরপ্তানি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং কাস্টমস লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,এই চুক্তি বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে,বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য নীতিতে।তার মতে, বাড়তি শুল্ক আরোপের পর তা কমানোর শর্ত হিসেবে নানা বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন,সামান্য শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য দেওয়া হয়েছে। বোয়িং বিমান কেনা ও এলএনজি আমদানির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন,নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে এমন চুক্তি সই করা বিতর্কিত।নির্বাচিত সরকার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেত।
অশুল্ক বাধা কমানোর উদ্যোগ
চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) অনুমোদিত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ বাংলাদেশ সরাসরি গ্রহণ করবে।আগে এসব পণ্যের ক্ষেত্রে দেশে পুনরায় পরীক্ষা ও অনুমোদনের প্রয়োজন হতো।কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে পুরোনো ‘ডাবল ফিউমিগেশন’ শর্তও শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সার্বিক চিত্র
চুক্তিকে সরকার বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে দেখালেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন,এতে বাংলাদেশের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা বাড়তে পারে।সামান্য শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে প্রতিরক্ষা,জ্বালানি,ডিজিটাল তথ্য ও শ্রম খাতে বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে তারা মন্তব্য করেছেন।
চুক্তিটি কার্যকর হলে এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব কী হবে—তা এখন সময়ই বলে দেবে।
![]()


















































সর্বশেষ সংবাদ :———