প্রতিনিধি ১১ জানুয়ারি ২০২৬ , ২:৫৬:০২ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু চরিত্র বারবার ফিরে আসে—নতুন মুখোশে,নতুন বয়ানে,কিন্তু পুরোনো অভ্যাসে।মাহমুদুর রহমান সেই তালিকারই এক পরিচিত নাম। আজ যিনি নিজেকে তীব্র ভারতবিদ্বেষী,বিপ্লবী ও নৈতিকতার ধ্বজাধারী হিসেবে উপস্থাপন করছেন,তাঁর অতীত কি আদৌ সেই দাবিকে সমর্থন করে? নাকি ইতিহাস বলছে ভিন্ন কিছু?

সম্পাদকীয় দৃষ্টিতে বিষয়টি আবেগ নয়,দলিলের।আর সেই দলিল ছড়িয়ে আছে দেশের প্রথম সারির পত্রিকার পাতায়—যুগান্তর,প্রথম আলো,জনকণ্ঠসহ বহু জাতীয় দৈনিকে।
একসময় সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন মাহমুদুর রহমান।একই সময়ে তিনি বেক্সিমকো গ্রুপের পরিচালক হিসেবেও সুবিধা গ্রহণ করেছেন—যা সরাসরি চাকরিবিধি লঙ্ঘনের শামিল। প্রশ্ন হলো,রাষ্ট্রের বেতনভোগী একজন কর্মকর্তা কীভাবে একই সঙ্গে একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর বেতনভোগী হন?রাষ্ট্র কি তখন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল,নাকি ক্ষমতার ছায়াতেই এসব সম্ভব হয়েছিল?
আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে উত্তরার সেই আলোচিত গোপন বৈঠককে ঘিরে।যেখানে ৩৫ থেকে ৪০ জন বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা গভীর রাতে একত্রিত হন,সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে আলো নিভিয়ে,মুখ ঢেকে পালিয়ে যান।যদি সবকিছুই বৈধ ও স্বচ্ছ হতো,তবে এই ভয়,এই পলায়ন কেন?অপরাধবোধ ছাড়া কি কেউ এভাবে মুখ লুকিয়ে পালায়?
রাজনীতিতে মাহমুদুর রহমানের ভূমিকা বরাবরই রহস্যজনক। এক এগারোর আগে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গোপন বৈঠক বিএনপিকে যে কতটা বিব্রত করেছিল,তা সে সময়ের রাজনীতি সচেতন মহলের অজানা নয়।প্রশ্ন উঠেছিল—তিনি কি সরকারের কর্মকর্তা,না কি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক এজেন্ডার ধারক?
সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয় ভারতের টাটা গ্রুপের সঙ্গে করা চুক্তির প্রসঙ্গে।যে ব্যক্তি আজ ভারতবিদ্বেষকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের মূল স্তম্ভ বানিয়েছেন,তিনিই একসময় ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস ২০–২৫ বছরের জন্য নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস করে বিদেশি কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার এই উদ্যোগ কি ইতিহাস ভুলে গেছে?না কি সুবিধাবাদীরা ধরে নিয়েছে—জনগণের স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী?
আজ তুরস্কের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে,দেশপ্রেম ও আদর্শের কথা বললে সেটি কি বিশ্বাসযোগ্য হয়?দেশপ্রেম কি নাগরিকত্ব বদলালেই প্রমাণ হয়,নাকি নিজের দেশের সম্পদ,প্রতিষ্ঠান ও রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধতায়?
সম্পাদকীয়ভাবে আমরা মনে করি—মাহমুদুর রহমান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নন; তিনি এই অঞ্চলের এক শ্রেণির সুবিধাবাদী রাজনীতিক-আমলার প্রতীক।যারা সময় বুঝে রং বদলায়,আদর্শ বদলায়,শত্রু-মিত্র বদলায়—কিন্তু জবাবদিহি বদলায় না।
আজ প্রশ্নটা ব্যক্তিকে নিয়ে নয়,প্রবণতাকে নিয়ে।মুখোশের রাজনীতি আর কতদিন চলবে?ইতিহাসের পাতায় লেখা প্রশ্নগুলো কি চিরকাল উত্তরহীনই থেকে যাবে?
সত্য একদিন কথা বলবেই—মুখোশ যত শক্তই হোক।



























