প্রতিনিধি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ , ৪:৪০:০৮ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।প্রায় ১৫ বছর ধরে ধুঁকছে দেশের পুঁজিবাজার।২০১০ সালের পর আর এটি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।আলোচ্য সময়ে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।শেয়ারবাজারে দরপতন এখন নিত্যসঙ্গী।পতনের পাশাপাশি প্রতিদিনই বাজারে লেনদেন তলানিতে চলে যাচ্ছে।পুঁজিবাজারে দরপতনের কারণে বিভিন্ন সময় পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।তবে এর প্রধান কারণ হিসেবে মার্জিন ঋণ দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এদিকে মার্জিন ঋণ নিয়ে যারা বিনিয়োগ করেছেন, তারা সবচেয়ে বেশি বিপদে আছেন।সমস্যায় রয়েছে ঋণ দেওয়া মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোও।অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উভয় পক্ষকেই নিঃস্ব করছে মার্জিন ঋণ। দিন দিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।সামগ্রিকভাবে বাজারের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে,বর্তমানে বাজারে মার্জিন ঋণ ২০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।এর মধ্যে ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণাত্মক বা নেগেটিভ ইক্যুইটিতে পরিণত হয়েছে।অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক ঋণ আর আদায় হচ্ছে না।এতে অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও তাদের বিনিয়োগ
সক্ষমতা হারিয়েছে।বিভিন্ন সময়ে বাজার অতিমূল্যায়িত হওয়ার ক্ষেত্রেও এই ঋণ দায়ী।কারণ মৌলভিত্তির বাইরে দুর্বল কোম্পানিতেও ঋণ নিয়ে কারসাজি হয়।
মার্চেন্ট ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন,চক্রবৃদ্ধি সুদে দেনা শোধ করতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের।একদিকে মার্জিন ঋণের ফাঁদে দেউলিয়া হওয়া; অন্যদিকে ঋণ দেওয়ার সীমাহীন অনিয়ম।দুয়ে মিলে মার্জিন ঋণ এখন বিনিয়োগকারীদের গলার কাঁটা।
প্রসঙ্গত,গ্রাহককে শেয়ার কিনতে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউস থেকে যে ঋণ দেওয়া হয়,তাকে মার্জিন ঋণ বলে। গ্রাহককে দেওয়া ঋণের অর্থও আবার সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউস অন্য কোনো উৎস থেকে ঋণ হিসাবে নেয়।ফলে গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ ফেরত না পেলেও তাদের ওই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে।এ কারণে দাম কমে গেলে গ্রাহকের শেয়ার তারা ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রি) করে।২০১০ সালে গ্রাহকের বিনিয়োগের বিপরীতে দশগুণ পর্যন্ত ঋণ দিয়েছিল বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস।এর ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে,তা পুরো দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
জানা গেছে,বর্তমানে শেয়ারবাজারে ৪৫০ ব্রোকারেজ হাউস, ৬৭ মার্চেন্ট ব্যাংক,৩৯ সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান ও ৮টি ঋণমান যাচাইকারী সংস্থা রয়েছে।বাজারের আকার বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের এই সংখ্যা অনেক বেশি। এ কারণে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার পথে প্রধান অন্তরায় মার্জিন ঋণ বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবেও মার্জিন ঋণ নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। মার্জিন ঋণের ভয়াবহতা নিয়ে ২০১৭ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ।সেখানে বলা হয়,বাজার উত্থান-পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো মার্জিন ঋণ।একই বিষয়ে জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব মুয়েনস্টারের এক প্রতিবেদনে মার্জিন ঋণকে বাজারের জন্য অভিশাপ হিসাবে দেখানো হয়।এতে বলা হয়, আর্থিকভাবে শক্তিশালী বিনিয়োগকারীরা মার্চেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে আঁতাত করে বেশি পরিমাণে ঋণ নেয়।এর ফলে তারা ইচ্ছামতো দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে। আর বাজার ধীরে ধীরে অতিমূল্যায়িত হয়।এরপর বাজারে মূল্য সংশোধন হলে তুলনামূলকভাবে কম পুঁজির সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।পুঁজিবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১১ সালে গঠিত স্কিম কমিটির হিসাবে দেখা যায়,শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণ নিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেনÑ এমন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ৬ লাখ ৬৯ হাজার।আর তাদের মোট ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার ৭০ কোটি টাকা।
মার্জিন ঋণকে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতার প্রধান অন্তরায় উল্লেখ করে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্ট ফোরামের সাবেক জিয়াউর রহমান বলেন,মার্জিন ঋণ বিনিয়োগকারী ও বাজার উভয়ের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এ ঋণ বাজারে উপকারের চেয়ে ক্ষতি করছে বেশি।এর কিছু কারণও আছে। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ ততটা ম্যাচিউরড নন। তারা তাদের সামর্থ্যরে বাইরে অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে ফেলেন। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়,চাঙা বাজারেই তারা ঋণের প্রতি বেশি ঝোঁকেন।ফলে বাজারে যখন মূল্য সংশোধন হয়,তখন তাদের ক্ষতিটা হয় অনেক বেশি।দাম কমে গেলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান অনুপাত ঠিক রাখার জন্য নতুন করে গ্রাহককে টাকা জমা দিতে বলে,তখন তারা তা পারে না। বাধ্য হয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তখনকার বাজারমূল্যে শেয়ার বিক্রি করে দেয়,যাকে আমরা ফোর্সড সেল বলি।এতে বিনিয়োগকারী ব্যাপক ক্ষতির শিকার হন।অন্যদিকে ফোর্সড সেলের চাপে বাজারে আরও দরপতন হয়।তাতে আরও বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্ট ফোর্সড সেলের আওতায় চলে আসে।এ দুষ্ট চক্রের কারণে বাজার সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারে না।
জিয়াউর রহমান আরও বলেন,যদিও বিধিমালার কারণে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষতি হয় না।তারা শেয়ার বিক্রি করে ঋণের টাকা সমন্বয় করে নেয়।কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আসলে তাদেরও ক্ষতি হয়।কারণ মার্জিন ঋণের খপ্পরে পড়ে পুঁজি হারাতে থাকলে একসময় গ্রাহক বাজার ছেড়ে চলে যান।আর তারা গ্রাহক হারায়।অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা বাজার নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলায় সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।এ সংকটের উত্তরণে বিনিয়োগকারীরা ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান উভয়ের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন,শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে ডিএসইর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ চারটি কাজকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।এগুলো হলোÑ সরকারের দিক থেকে শেয়ারবাজারের জন্য আলাদা কর প্রণোদনার ব্যবস্থা করা,দেশি-বিদেশি কিছু ভালো কোম্পানিকে যত দ্রুত সম্ভব বাজারে আনা,ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নেগেটিভ ইক্যুইটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা এবং শেয়ারবাজারে সুবিধাভোগী লেনদেন ও কারসাজি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।









