প্রতিনিধি ৯ জানুয়ারি ২০২৬ , ১০:০২:১০ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মাইনাস ফোর’ কোনো কল্পকথা নয়;এটি একটি রাজনৈতিক ফলাফলকেন্দ্রিক প্রকল্পের নাম—যার লক্ষ্য চার শীর্ষ নেতৃত্বকে কার্যত অকার্যকর করে একটি নেতৃত্বশূন্য রাষ্ট্র বাস্তবতা তৈরি করা।এই প্রকল্পের অস্তিত্ব বোঝা যায় প্রশ্নে নয়,ঘটনার ধারাবাহিকতায়।

অনুসন্ধানী বাস্তবতা এক: চার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার কারও অবস্থানই আজ স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নেই—কেউ প্রবাসে,কেউ চিকিৎসাজনিত অক্ষমতায়,কেউ আইনি জালে,কেউ কার্যত নির্বাসিত বাস্তবতায়।এই সমাপতনকে ‘দুর্ঘটনা’ বলা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সরলতা হবে।কারণ,গণতন্ত্রে এমন সমাপতন ঘটে না—ঘটে পরিকল্পনায়।
অনুসন্ধানী বাস্তবতা দুই: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ার মতো।১৯৪৭ ও ১৯৭১—দুই সময়েই একটি সুবিধাভোগী দালাল শ্রেণি সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ঘটিয়েছে।আজ সেই শ্রেণির বংশগত ও আদর্শিক উত্তরসূরিরা ‘নাগরিক’, ‘সমন্বয়ক’ কিংবা ‘নিরপেক্ষ মুখ’ সেজে একই কাজ করছে—রাজনীতি দুর্বল করা,নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ করা, এবং প্রতিষ্ঠানকে ফাঁপা করা।
অনুসন্ধানী বাস্তবতা তিন: বিদেশি প্রভাবের প্রশ্নটি অনুমান নয়,এটি কূটনৈতিক বাস্তবতা।আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় ‘ম্যানেজেবল স্টেট’ চায়—যেখানে শক্তিশালী নেতৃত্ব নয়,বরং দুর্বল ও নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিসর থাকে। নেতৃত্বহীনতা সেই লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর পথ। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে—আইনি প্রক্রিয়া,ভিসা নীতি, আর কূটনৈতিক চাপ একত্রে ব্যবহার হলে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায়।
অনুসন্ধানী বাস্তবতা চার: ‘আইনের শাসন’ শব্দটি এখানে ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।আইন প্রয়োগ যদি সমান হতো, তাহলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা,দলীয় নেতৃত্ব বিকাশ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সমানভাবে নিশ্চিত হতো।কিন্তু বাস্তবে আইন ব্যবহৃত হচ্ছে নির্বাচনী ভারসাম্য ভাঙার যন্ত্র হিসেবে—এটি রাজনৈতিক প্রকল্পের স্পষ্ট লক্ষণ।
এখানে সম্পাদকীয় অবস্থান স্পষ্ট: নেতৃত্ব শূন্য করা কোনো সংস্কার নয়,এটি রাষ্ট্র দুর্বল করার কৌশল।যে সমাজে রাজনীতি নেই,সেখানে নাগরিক অধিকার টেকে না।যে রাষ্ট্রে নেতৃত্ব নেই,সেখানে সিদ্ধান্ত নেয় অদৃশ্য শক্তি।
আজ যারা ‘মাইনাস ফোর’ অস্বীকার করে,তারা একটি প্রশ্নের উত্তর দেয় না—এই ধারাবাহিকতায় কারা লাভবান? লাভবান হচ্ছে সেই শক্তিগুলো,যারা নির্বাচন নয়,নিয়ন্ত্রণ চায়; বিতর্ক নয়,ব্যবস্থাপনা চায়।
বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—দালালনির্ভর রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সার্বভৌমত্বের ক্ষতি করেছে।তাই এই সম্পাদকীয়র সিদ্ধান্ত দ্ব্যর্থহীন: ‘মাইনাস ফোর’ বাস্তবায়িত হলে তা কোনো দলের পরাজয় নয়,হবে রাষ্ট্রের পরাজয়।এখনই এই নীলনকশা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নেতৃত্বহীন,রাজনীতিশূন্য এবং সহজে নিয়ন্ত্রিত একটি ভূখণ্ডে পরিণত হবে—যার দায় ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
















