সম্পাদকীয়

ভোটহীন নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় বৈধতার প্রশ্ন

  প্রতিনিধি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৩:০৭:১৮ প্রিন্ট সংস্করণ

ভোটহীন নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় বৈধতার প্রশ্ন

মাজহারুল ইসলাম।।একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈধতা নির্ধারিত হয় তার নির্বাচনের মাধ্যমে।কিন্তু বাংলাদেশে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই বৈধতার ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।এই দুটি নির্বাচন শুধু বিতর্কিত নয়—এগুলো কার্যত ভোটারবিহীন নির্বাচনের উদাহরণ,যা দেশের গণতন্ত্রকে গভীর সংকটে নিক্ষেপ করেছে।

৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের নির্বাচন যদি রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতো,তাহলে ২০০৮ সালের মতোই বিএনপি অন্তত ৩২ শতাংশ ভোট পেয়ে সংসদে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারত।বাস্তবতা হলো—সমঝোতার পথ পরিহার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের দিকে হাঁটার সিদ্ধান্তই আজকের রাজনৈতিক অচলাবস্থার সূচনা করেছে।

এই সংকটের দায় শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নয়—এ দায় আওয়ামী লীগবিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তিরও। রাজপথের কৌশল,নির্বাচন বর্জন ও অনমনীয় রাজনীতির ফলে সাধারণ ভোটারকে কার্যত রাজনীতির বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।ক্ষমতার লড়াইয়ে জনগণ এখানে কেবলই পরিসংখ্যান।

পরিসংখ্যান নির্মম সত্য তুলে ধরে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রায় ৫৯ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেননি।অথচ বিতর্কমুক্ত নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৫ থেকে ৭৩ শতাংশ।অর্থাৎ,দুটি নির্বাচনে প্রায় ৩২ শতাংশ নাগরিককে পরিকল্পিতভাবেই ভোটের বাইরে রাখা হয়েছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে পেয়েছিল প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট।বিএনপি পেয়েছিল ৩২ শতাংশ এবং জামায়াতসহ বিএনপি-জোট পেয়েছিল প্রায় ৩৭ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে জনগণের রায় ছিল বিভক্ত, কিন্তু অংশগ্রহণমূলক। আজ সেই অংশগ্রহণই অনুপস্থিত।

আন্তর্জাতিক জরিপগুলো পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থার (IIR) জরিপ অনুযায়ী,আওয়ামী লীগ ব্যতীত যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ভোটার উপস্থিতি ৫৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে,তবে বিএনপি পেতে পারে প্রায় ৩০ শতাংশ ভোট,জামায়াত প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট।অবশিষ্ট প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট যাবে অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দিকে।

এই ৪৪ শতাংশ ভোটই আজ সবচেয়ে বড় বিপদের ইঙ্গিত দেয়।যদি এই ভোট একতরফাভাবে ব্যবহৃত হয় বা কৃত্রিমভাবে বৈধতা তৈরির কাজে লাগানো হয়,তাহলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু বিতর্কিত নয়—সাংবিধানিক সংকটে পরিণত হবে।এমন সংসদের ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে অসম্ভব।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি ভোটার।ভোটারকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হয়, সরকার হয়—কিন্তু বৈধতা জন্ম নেয় না।রাজনৈতিক দলগুলোর এখনো সময় আছে উপলব্ধি করার যে,ক্ষমতা নয়—গ্রহণযোগ্যতাই রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখে।অন্যথায়,ভবিষ্যৎ নির্বাচন নয়—ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রই প্রশ্নের মুখে পড়বে।

আরও খবর

Sponsered content