লেখক ও কলামিস্ট এবং মন্তব্য কলাম:-

ভারতবিরোধী স্লোগান বনাম আমদানি বাস্তবতা

  প্রতিনিধি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ১:২৯:৩৩ প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতবিরোধী স্লোগান বনাম আমদানি বাস্তবতা

মাজহারুল ইসলাম।।বিভিন্ন সময় সরকারসংশ্লিষ্ট মহল থেকে ভারতের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা শোনা যায়।নানা ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আহ্বানও ওঠে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ (ডিসেম্বর,অর্থ বিভাগ) অনুযায়ী ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য আমদানির প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে ভারত থেকেই আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি—৭.৮৩ শতাংশ।অর্থাৎ ভারতবিরোধী বক্তব্য ও অনলাইন বয়কটের আহ্বান বাস্তবে আমদানিতে কোনো প্রভাব ফেলেনি।

ভারত থেকে আমদানি কেন বাড়ছেই?

এটি কোনো রাজনৈতিক পছন্দের ফল নয়,বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতার ফল।

ভৌগোলিক নিকটতা: পরিবহন খরচ কম,সরবরাহ দ্রুত

মূল্য প্রতিযোগিতা: খাদ্যশস্য,পেঁয়াজ,চাল,চিনি ও শিল্পের কাঁচামাল ভারত তুলনামূলক সস্তায় সরবরাহ করতে পারে

শিল্পনির্ভরতা: টেক্সটাইল,ওষুধ,বিদ্যুৎ ও নির্মাণ খাতে ভারতীয় কাঁচামালের বড় ভূমিকা

বিকল্প বাজারের সীমাবদ্ধতা: চীন,ব্রাজিল বা ইউক্রেন থেকে আমদানি করলে খরচ ও সময়—দুটোই বেড়ে যায়

এখানে “ইচ্ছা” নয়, কাজ করে বাধ্যতা।

সোশ্যাল মিডিয়ার বয়কট বনাম রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য

ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ ভারতীয় পণ্য না কিনলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্য নিরাপত্তা,শিল্প উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী।

বয়কট যদি রাষ্ট্রীয় নীতি না হয়,তাহলে তার কোনো প্রভাব জাতীয় আমদানি পরিসংখ্যানে পড়বে না—এটাই স্বাভাবিক।

আমদানির পরিসংখ্যান কী বলছে?

বাংলাদেশে আমদানির প্রধান উৎসভিত্তিক ব্যয় ও প্রবৃদ্ধি
(অর্থবছর ২০২৩–২৪ ও ২০২৪–২৫, একক: কোটি টাকা)
সূত্র: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫, বণিক বার্তা

দেশ ২০২৩–২৪ ২০২৪–২৫ প্রবৃদ্ধি (%)

ভারত ৮৯৮.৯ ৯৬৯.৩ ৭.৮৩
চীন ১,৯০৪.৯ ২,০৫২.২ ৭.৭৩
সিঙ্গাপুর ২১২.৯ ২২৬.৮ ৬.৫৩
দক্ষিণ কোরিয়া ১০৮.২ ১১২.৭ ৪.১৬
জাপান ১৯৫.২ ১৯৬.৮ ০.৮২
হংকং ২৫.৫ ২৫.৬ ০.৩৯
তাইওয়ান ৯৭.৩ ৮৯.৫ -৮.০২
যুক্তরাষ্ট্র ২৮৮.৩ ২৫০.৬ -১৩.০৭
মালয়েশিয়া ২২২.৭ ১৯১.১ -১৪.১৯
অন্যান্য ২,৭১৮.৬ ২,৭২০.৮ ০.০৮

“বয়কট ভারত” রাজনীতি কেন টিকে থাকে?

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই রাজনীতি সহজে বিক্রি হয়, কারণ—

জনগণের মধ্যে ঐতিহাসিক আবেগ রয়েছে

প্রতিবেশী দেশকে টার্গেট করে দ্রুত রাজনৈতিক পয়েন্ট তোলা যায়

কিন্তু ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রের বাস্তব চাহিদা বদলায় না

ফলে বিরোধী রাজনীতির স্লোগান আর শাসনক্ষমতার বাস্তবতা আলাদা পথে হাঁটে।

তাহলে লাভ কী?

✔️ রাজনৈতিক লাভ: বক্তব্যে, জনসভায়, ভোটের মাঠে

❌ অর্থনৈতিক লাভ: প্রায় শূন্য

❌ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ও দ্বিমুখী বার্তা

ভারতনির্ভরতা কমাতে হলে স্লোগান নয়, দরকার—

শিল্প বৈচিত্র্য

বিকল্প সরবরাহ বাজার

নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

এসব ছাড়া ভারতবিরোধী হম্বিতম্বি কেবল সস্তা আবেগী রাজনীতি—রাষ্ট্র পরিচালনায় যার কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই।

সারকথা

ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে জনমত তৈরি করা যায়,
কিন্তু রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ছাড়া ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করা যায় না।

এম মাজহারুল ইসলাম
সাংবাদিক,লেখক ও কলামিস্ট

আরও খবর

Sponsered content