প্রতিনিধি ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৪:৩৬:৪৬ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ শ্লোগানকে যারা রাষ্ট্রচিন্তার নতুন দিগন্ত বলে প্রচার করছেন, তারা হয় সংবিধান পড়েননি,নয়তো পড়েও অস্বীকার করছেন। কারণ রাষ্ট্র পরিচালিত হয় শ্লোগানে নয়—সংবিধান,আইন ও বৈধতার ভিত্তিতে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে বলছে—
> “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”
আর ৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান বহির্ভূত ক্ষমতা দখল রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল।
সুতরাং জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া,বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে যদি নির্বাচন হয়—তা শুধু রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়,সংবিধান লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ।
একতরফা নির্বাচন: আইন কী বলে?
সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ বলছে—
> গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি।
আর ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ হতে হবে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল।
ভোটারবিহীন,অংশগ্রহণহীন নির্বাচন এই অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।
Representation of the People Order (RPO), 1972 অনুযায়ী—
অবাধ,সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত করা হলে নির্বাচন আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও রাষ্ট্রক্ষমতা
তারেক রহমান একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামি—এটি কোনো রাজনৈতিক অপবাদ নয়,আদালতের রায়।
ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করলে তা Rule of Law-এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
আরো গুরুত্বপূর্ণ—
সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখার অঙ্গীকার করে।
অথচ জামায়াতে ইসলামীর মতো উগ্র ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বলা মানেই সংবিধানের এই মৌলিক নীতিকে পদদলিত করা।
জামায়াত প্রশ্ন: আইনের চোখে
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন,১৯৭৩ অনুযায়ী—
যে রাজনৈতিক শক্তি মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত,তাদের পুনর্বাসন শুধু নৈতিক প্রশ্ন নয়—আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন।
তারেক রহমান যদি জামায়াতের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে ব্যর্থ হন,তাহলে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নয়—
এটি হবে সংবিধান লাস্ট নীতি।
আন্তর্জাতিক বৈধতা ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ
আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিতে একটি সরকার তখনই বৈধতা পায় যখন—
নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক
বিরোধী দল দমনের প্রমাণ নেই
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে কাজ করে
এই মানদণ্ডে যদি বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়,তবে রাষ্ট্রের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা,বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা অনিবার্য।
ভারত,চীন কিংবা রাশিয়া—কেউই সংবিধান লঙ্ঘন করে গঠিত সরকারকে দীর্ঘমেয়াদে সমর্থন দেয় না। ইতিহাস তার সাক্ষী।
ইতিহাস ও আইন—একই সতর্কবার্তা দেয়
১৯৮৬—এরশাদ
১৯৯৬—খালেদা জিয়া
২০০৬—ইয়াজউদ্দিন
প্রতিবারই সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে—
প্রতিবারই পরিণতি হয়েছে অপমানজনক পতন।
সংবিধানের ৫৬ ও ৫৭ অনুচ্ছেদ প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা দেয়,
কিন্তু সেই ক্ষমতার উৎস যদি অবৈধ হয়—
তবে সরকার আইনের চোখে নড়বড়ে ও অস্থায়ী।
শেষ কথা
চাঁদ দেখে ঈদ হয়।
শ্লোগান দেখে রাষ্ট্র চলে না।
একতরফা নির্বাচন করে সরকার গঠন করা সম্ভব—
কিন্তু সংবিধান ভেঙে রাষ্ট্র বাঁচানো অসম্ভব।
বাংলাদেশের ইতিহাস,আইন ও সংবিধান একসুরে বলছে—
যেনতেন নির্বাচন মানেই আইনবিহীন ক্ষমতা, আর আইনবিহীন ক্ষমতার শেষ ঠিকানাই পতন।










