সম্পাদকীয়

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’—রাষ্ট্র নয়,ক্ষমতার ফার্স্ট প্রজেক্ট

  প্রতিনিধি ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৪:২৬:৫১ প্রিন্ট সংস্করণ

মাজহারুল ইসলাম।।তারেক রহমানের মুখে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ শুনে যারা ইতোমধ্যেই বিজয়োল্লাসে মেতেছেন,তারা হয় ইতিহাস ভুলে গেছেন,নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে আছেন।শ্লোগান আর রাষ্ট্র পরিচালনা এক জিনিস নয়। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ যেখানে ছিল শক্তিশালী রাষ্ট্রের আত্মকেন্দ্রিক কৌশল,সেখানে তারেকের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ আদতে ক্ষমতা দখলের এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক মোড়ক—যার ভেতর লুকিয়ে আছে জামায়াত-নির্ভর উগ্র রাজনীতির ছায়া।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আজও অনুচ্চারিত—তারেক রহমান কি আদৌ জামায়াতে ইসলামের রাজনীতির বিরুদ্ধে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন?নাকি তিনি জামায়াতের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজের লক্ষ্য হাসিল করতে চাইছেন?বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ‘কাঁধে বন্দুক’ রাজনীতির পরিণতি যে কী ভয়াবহ, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশে আদৌ কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কি না—এই প্রশ্ন এখন শুধু দেশের মানুষের নয়,পুরো বিশ্বের।আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে মাঠের বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচন আয়োজন মানেই গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা।এমন নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে—এই কল্পনা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক ধরনের রাজনৈতিক আত্মপ্রবঞ্চনা।

অর্থনীতির অবস্থা আরও ভয়ংকর।বাংলাদেশ কার্যত একটি মৃতপ্রায় অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে।বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ ইতোমধ্যেই দেশ ছেড়েছে।উগ্রবাদী জামায়াতের পুনরুত্থান বিনিয়োগ পরিবেশে শেষ পেরেক মারছে।ভারত নীরব, রাশিয়া স্পষ্ট,চীন সতর্ক।শেখ হাসিনা-বিহীন নির্বাচন যে তারা মেনে নেবে না—এটা কোনো গুজব নয়,বরং কূটনৈতিক বাস্তবতা।

তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে ‘সবুজ সংকেত’ তত্ত্ব যারা ছড়াচ্ছেন,তারা ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার আসামি তারেক রহমান ভারতের কাছে কখনোই ‘স্বস্তির চরিত্র’ নন।সর্বোচ্চ যা বলা যায়—ভারতের কাছে তিনি ‘মন্দের ভালো’।কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভারত তারেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত।বরং এই মুহূর্ত থেকে নির্বাচন পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি দিল্লির কড়া নজরদারিতে থাকবে।

ইতিহাস নির্মম সাক্ষী—
১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৬—প্রতিটি একতরফা নির্বাচন শেষে ক্ষমতার পতন হয়েছে লজ্জাজনকভাবে।
খালেদা জিয়ার একতরফা সরকার তিন মাসও টেকেনি।
এরশাদের ‘নির্বাচিত’ সরকার চার বছরের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে ভেঙে পড়েছে।

ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক নাটক শেষ হয়েছে জেল আর পালানোর অধ্যায়ে।

তারেক রহমান যদি মনে করেন একতরফা নির্বাচন মানেই পাঁচ বছরের নিশ্চিন্ত শাসন—তাহলে সেটি নিছক রাজনৈতিক বোকামি।প্রশ্ন বরং উল্টো—একতরফা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হলে সেই গদিতে তিনি কতদিন টিকবেন?

সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা হলো—জামায়াত কি আদৌ তারেককে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে দেবে?পাকিস্তানে যেভাবে শাহবাজ শরীফকে সামনে রেখে প্রকৃত ক্ষমতা অন্য হাতে—বাংলাদেশেও কি সেই মডেলই চাপিয়ে দেওয়া হবে না? তারেক রহমান কি শেষ পর্যন্ত ইমরান খানের মতোই ব্যবহৃত হবেন?

বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার জিও–পলিটিক্সের দাবার বোর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি।চীন ও ভারতের সমর্থন ছাড়া এখানে কোনো সরকার টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।অথচ যে পথে দেশকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তাতে সেই সমর্থন দুটোরই দূরে সরে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, অবকাঠামো,আঞ্চলিক সংযোগ ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার জায়গা থেকে হঠাৎ করে পেছনের দিকে যাত্রা শুরু করলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না।উন্নয়নের ইট বিক্রি করে খাওয়ার রাজনীতি দিয়ে রাষ্ট্র চলে না।ভিক্ষা-নির্ভর পাকিস্তান মডেল বাংলাদেশে আমদানি করার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

বাংলাদেশ একটি অসম্ভবের দেশ—এখানে অসম্ভবও সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস একটাই শিক্ষা দেয়:যেনতেন নির্বাচন মানেই অস্থায়ী ক্ষমতা,স্থায়ী অস্থিরতা এবং অনিবার্য পতন।

চাঁদ দেখে ঈদ হয়,কিন্তু তারেকের ফেরা দেখে গণতন্ত্র হয় না।রাষ্ট্র নিয়ে জুয়া খেললে—শেষ পর্যন্ত হারে রাষ্ট্রই।

আরও খবর

Sponsered content