নিজস্ব প্রতিবেদক।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ঘটনাগুলো প্রায়শই দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।বিশেষ করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব এই প্রেক্ষাপটে প্রায়শই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনের পরিস্থিতি
২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৮টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ মহাজোট ওই নির্বাচন বর্জন করায় মূলত বিএনপি ও তাদের মিত্রদের প্রার্থীরাই এই আসনগুলোতে জয়ী ঘোষিত হয়েছিলেন।তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ১১ জানুয়ারি (১/১১) জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং পরবর্তীতে ওই নির্বাচন বাতিল করা হয়।
২. দুর্নীতিতে বিএনপি ও বিতর্ক
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর তালিকায় বিএনপি শাসনামলে (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশ টানা পাঁচবার দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানে ছিল।বিএনপির দাবি ছিল যে,এই তালিকায় ১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগ শাসনামলের দুর্নীতির তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল।তবে বাস্তবতা অনুসারে,টিআই-এর প্রতিবেদনের সূচক প্রশাসনিক স্বচ্ছতা,রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়।আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ওই সময়ের সুশাসনের অভাবকে মূল কারণ হিসেবে ধরা হয়।
৩. সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিতর্ক
২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার (ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দীন সরকার) নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও চলছে।বিএনপির অভিযোগ ছিল,ওই সরকার আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছে এবং বিএনপিকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়েছে। অন্যদিকে,আওয়ামী লীগের পক্ষ দাবি করে যে ওই সরকারের কিছু সংস্কার,যেমন ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরি, তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।সেই সময় আওয়ামী লীগও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল এবং শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হয়েছে।
৪. ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ও বিএনপির অনুপস্থিতি
২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের জোট অংশগ্রহণ না করার প্রধান কারণ ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বাতিল। ২০১১ সালে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনের দায়িত্ব দলীয় সরকারের অধীনে আনা হয়।বিএনপি দাবি করেছিল,শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।
৫. ২০১৮ সালের নির্বাচন ও বিএনপির অংশগ্রহণ ও পরাজয়
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার এবং আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। দলটির তৃণমূল কর্মীরা দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় কোণঠাসা ছিল।তবে বিএনপির জন্য এই নির্বাচন ভরাডুবি হিসেবে রেকর্ড করা হয়।বিএনপির অভিযোগ ছিল ব্যালট বাক্স পূরণ,ব্যাপক কারচুপি এবং নেতাকর্মীদের ওপর মামলা-হামলা। অন্যদিকে সরকারের মতে,বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতার অনুপস্থিতিই তাদের ভরাডুবির মূল কারণ।
৬. ২০২৪ সালের নির্বাচন ও আওয়ামী লীগ একতরফা বিজয়
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অংশগ্রহণ করেনি।বিএনপি অভিযোগ করেছে যে, সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগিদ উপেক্ষা করে একতরফা নির্বাচন করেছে।অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ দাবি করে যে,সংবিধান রক্ষার জন্য এই নির্বাচন করা হয়েছে।নির্বাচনের ফলাফল অনুসারে,আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসে।তবে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের বৈধতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অবস্থান এবং তাদের নীতি ও কৌশল পরস্পর বৈষম্যমূলক।নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও বর্জনের পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতা,প্রশাসনিক পরিবেশ এবং নেতৃত্বের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।এই দ্বন্দ্ব দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনে এই চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গেছে।
![]()

















































সর্বশেষ সংবাদ :———