প্রতিনিধি ৩০ নভেম্বর ২০২৫ , ৩:৫১:৪১ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে আবারও অস্থিরতার ছায়া নেমেছে।শুক্রবার বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র,শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় একটি গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেনঃ- দেশের দুই বড় দল—আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি—এর নেতৃত্ব পরিবর্তনে বিদেশি শক্তির এক ‘খেলা’ চলছে।এতে বাংলাদেশের সুশীল সমাজও জড়িত,যা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করার চক্রান্ত।

শনিবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ফেসবুকে এক পোস্টে জানান,তার মায়ের ক্রিটিক্যাল অবস্থায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তার একক নিয়ন্ত্রণে নেই।
এই দুই ঘটনা মিলিয়ে যখন ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র ছায়া দেখা দিয়েছে,তখন প্রশ্ন উঠছেঃ-বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে? এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ কি এই ষড়যন্ত্রের ফল ভোগ করবে?
সজীব ওয়াজেদ জয়ের অভিযোগঃ-বিদেশি ‘খেলা’ দিয়ে দলীয় নেতৃত্ব ‘শুদ্ধিকরণ’
সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকারে (২৮ নভেম্বর) বর্ণিত চিত্রটি চাঞ্চল্যের মতো।তিনি বলেন,বিদেশি শক্তিগুলো আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার জন্য এক ‘সিনিস্টার গেম’ চালাচ্ছে।এতে স্থানীয় সুশীল সমাজের কিছু অংশও যুক্ত,যারা ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ বা ‘রিফাইন্ড বিএনপি’র ধারণা প্রচার করে দলগুলোকে ‘ফিল্টার’ করতে চায়।
জয় এই বিষয়টিকে ২০০৭-এর ‘১/১১’ যুগের সাথে তুলনা করেন,যখন সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বড় দলের নেতৃত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল।
“দুই দলই জনগণের ভোটে গড়া,কিন্তু এখন বাইরের শক্তি নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে চায়। এটা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র,” জয় জানান।
তারেকের অসহায়ত্বঃ-ফেরার সিদ্ধান্ত ‘আমার হাতে নেই’
তারেক রহমানের শনিবারের পোস্টটি আরও চিন্তার কারণ। মায়ের (খালেদা জিয়া) চেস্ট ইনফেকশনের কারণে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় তিনি লন্ডন থেকে লিখেছেনঃ- “যেকোনো সন্তানের মতো আমি মায়ের পাশে থাকতে চাই, কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আমার একক নিয়ন্ত্রণে নেই।”
তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে ফেরা সম্ভব হবে।
ইন্টারিম গভর্নমেন্টের প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম বলেছেন,সরকারের কোনো আপত্তি নেই তারেকের ফেরায়।
কিন্তু তারেকের কথায় স্পষ্ট যে,এর পেছনে বিদেশি চাপ বা অভ্যন্তরীণ গ্রুপের প্রভাব রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন,এটা ‘ডিপ স্টেট’-এর সাথে যুক্ত—যেখানে সামরিক,গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিদেশি শক্তি নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করে।
তারেকের এই অসহায়ত্ব বিএনপির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা প্রকাশ করে,যা সজীবের অভিযোগের সাথে মিলে যায়।
‘মাইনাস টু ফর্মুলাঃ-ডিপ স্টেটের পুরনো খেলা,নতুন ছলে
২০০৭-এর ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা ছিল শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব গড়ার চক্রান্ত।সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এটি চালিয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়।
গত একবছরে বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির মির্জা আব্বাসসহ কয়েকজন নেতা একাধিকবার বলছেন,এক ‘নতুন মাইনাস টু’ চলছে—আওয়ামী লীগের পর বিএনপিকে সাইডলাইন করে দেশকে ‘ডিপলিটিসাইজ’ করা।
এতে স্থানীয়-আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থন রয়েছে,যা ইসলামপন্থী দলগুলোকে উত্থানের সুযোগ দিচ্ছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, “এই ফর্মুলা আবার চিন্তা করবেন না—জনগণ কখনো মেনে নেবে না।”
কিন্তু বিএনপির অতীতের ‘দুমুখো’ ভাব এবং সিদ্ধান্তে দেরিতে ‘বাঁশ খাওয়া/ফলাফল ভোগ’ এখন নতুন করে প্রকাশ পাচ্ছে।তারেকের ফেরা না হলে দলের নির্বাচনী প্রস্তুতি (ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন) ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিএনপি এর ফল ভোগ করবে।
ভবিষ্যত বাংলাদেশের শঙ্কা
সজীবের সাক্ষাৎকার এবং তারেকের বক্তব্য মিলিয়ে চিত্র স্পষ্ট যে,বাংলাদেশের রাজনীতি আর দলীয় নেতাদের হাতে নেই। ডিপ স্টেট—সামরিক,গোয়েন্দা এবং বিদেশি শক্তির জোট—’মাইনাস টু’র মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে।এতে সুশীল সমাজের কিছু অংশ ‘রিফর্ম’র নামে সহায়তা দিচ্ছে,কিন্তু ফলাফল হচ্ছে গণতন্ত্রের দুর্বলতা।রাজনৈতিক পরিপক্বতা,প্রজ্ঞা এবং দক্ষতা এখন নয়,বরং বাইরের চাপেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। দেশের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ‘ডিপ স্টেট’-এর হাতে চলে যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন,এই খেলা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে রাখবে,যাতে নতুন শক্তি (ইসলামপন্থী বা অন্যান্য) উঠে আসতে পারে।
ইন্টারিম গভর্নমেন্টের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। জনগণের প্রশ্ন: কবে ফিরবে সত্যিকারের গণতন্ত্র?





