প্রতিনিধি ২০ জানুয়ারি ২০২৬ , ৩:২৫:৫৪ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সাম্প্রতিক মন্তব্য—“পদ্মা সেতুর দায় পরিশোধ করতে গিয়ে দেশে চালের দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়েছে”—দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি আবেগের নয়,বরং তথ্য ও যুক্তির আলোকে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

উক্তির প্রেক্ষাপট
উপদেষ্টার বক্তব্যের মূল সুর হলো—বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল ব্যয় দেশের কৃষি,সেচ ও খাদ্য উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত করেছে।তাঁর মতে,পদ্মা সেতুতে ব্যয় করা অর্থ যদি কৃষি উৎপাদন ও সেচ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হতো,তবে চালের দাম আরও কম রাখা সম্ভব হতো।এই বক্তব্য সরাসরি সেতুর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার না করলেও, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
চালের বাজার ও মূল্যস্ফীতির বাস্তব চিত্র
পরিসংখ্যান বলছে,২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
সরু চালের দাম ২০২২ সালে যেখানে ৬৪–৭৬ টাকার মধ্যে ছিল,২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা ৭০–৮৫ টাকায় পৌঁছেছে।
মোটা চালের দাম ৪৩–৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৫৪–৬০ টাকা।
এই মূল্যবৃদ্ধি একক কোনো প্রকল্পের ফল নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি,ডলারের সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার সম্মিলিত প্রতিফলন।
ডলার সংকট ও পদ্মা সেতুর ব্যয়
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে প্রায় ৩.৫৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে—যার প্রভাব পড়েছে আমদানি ব্যয়ে।ডলারের দাম ১২২–১২৯ টাকায় ওঠার ফলে চালসহ খাদ্যপণ্যের আমদানির খরচ বেড়েছে,যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট—পদ্মা সেতু সরাসরি চালের দামে “২০ টাকা যোগ” করেনি।তবে এটি এমন একটি ব্যয় কাঠামো তৈরি করেছে,যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়িয়েছে এবং সেই চাপের প্রতিফলন বাজারে পড়েছে।
সরকারি উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা
চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার আমদানিশুল্ক কমানো,চাল আমদানি এবং টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।এসব উদ্যোগ স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।কারণ বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে মজুতদারি,পরিবহন ব্যয় ও ডলার সংকট এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রয়োজনীয়তা বনাম অগ্রাধিকার
পদ্মা সেতু একটি কৌশলগত অবকাঠামো—এতে সন্দেহ নেই। এটি যোগাযোগ,বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে।তবে প্রশ্ন হলো,এমন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়,যখন তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি আনে।যদি উন্নয়নের ব্যয় জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়,তবে সেই উন্নয়নের অগ্রাধিকার ও ব্যবস্থাপনা নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
উপসংহার
পদ্মা সেতু প্রয়োজনীয় ছিল—কিন্তু এর ব্যয় ব্যবস্থাপনা, সময়কাল ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ঘাটতি ছিল কি না, সে প্রশ্ন আজ স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।বাণিজ্য উপদেষ্টার “২০ টাকা” মন্তব্যটি গাণিতিক হিসাবের চেয়ে একটি বাস্তব সংকেত—যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়,উন্নয়ন ও জনজীবনের ভারসাম্য রক্ষা না করলে তার খেসারত শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।
অতএব,ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বড় প্রকল্পের পাশাপাশি কৃষি,খাদ্য উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সমান গুরুত্ব দেওয়া—এটাই এখন সময়ের দাবি।















