সম্পাদকীয়

নির্বাচন না কি রাষ্ট্রযন্ত্রের পরীক্ষা?

  প্রতিনিধি ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৩:৩৭:১১ প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন না কি রাষ্ট্রযন্ত্রের পরীক্ষা?

মাজহারুল ইসলাম।।আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যে ঘটনাপ্রবাহ উন্মোচিত হচ্ছে,তা কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার লক্ষণ নয়।বরং এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা আজ কেবল ভোটার ও প্রার্থীর লড়াই নয়,এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক নৈতিকতার সরাসরি পরীক্ষা।

নির্বাচনের আগে যদি প্রশাসন,উপদেষ্টা মহল কিংবা প্রভাবশালী আমলাতন্ত্রের একটি অংশ সক্রিয়ভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে বেকায়দায় ফেলতে ভূমিকা রাখে, তবে সেটি আর রাজনৈতিক কৌশল থাকে না—তা পরিণত হয় সংবিধান লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারে।

রাষ্ট্র কি নিরপেক্ষ আম্পায়ার,না রাজনৈতিক খেলোয়াড়?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে আম্পায়ারের ভূমিকা পালন করা—খেলা সুষ্ঠু রাখা,কোনো দলকে বাড়তি সুবিধা না দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতায় যদি দেখা যায়,মনোনয়ন প্রত্যাহারের আগেই একদল প্রার্থীকে মামলা,প্রশাসনিক বাধা কিংবা অদৃশ্য চাপে কোণঠাসা করা হচ্ছে,তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে—রাষ্ট্র কি নিজেই খেলোয়াড় হয়ে উঠছে?

আন্তর্জাতিকভাবে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বলা হয় Election Meddling। এটি কেবল একটি দলের ক্ষতি করে না; এটি ভোটারদের আস্থাকে ধ্বংস করে এবং নির্বাচনের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

উপদেষ্টা ও আমলাতন্ত্র: সীমা কোথায়?

রাষ্ট্রের উপদেষ্টা ও উচ্চপদস্থ আমলারা সংবিধান অনুযায়ী জনগণের কর্মচারী।তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ থাকতে পারে,কিন্তু সেই পছন্দ যদি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী সমীকরণে প্রতিফলিত হয়,তবে সেটি ক্ষমতার সীমালঙ্ঘন।

নির্বাচনের আগে যদি উপদেষ্টা মহল থেকে রাজনৈতিক জোটের বিষয়ে তাগাদা আসে,কিংবা সচিবালয়ের ভেতর আদর্শিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পোস্টিং দেওয়া হয়—তবে তা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করে।

ছায়া রাজনীতি ও ‘বি-টিম’ সংস্কৃতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়—ছায়া দল,বি-টিম, কৃত্রিম প্ল্যাটফর্ম।কিন্তু সমস্যা হয় তখনই,যখন এই ছায়া রাজনীতি জনগণের সামনে ভিন্ন মুখ দেখিয়ে,ভেতরে ভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে কাজ করে।

যে রাজনৈতিক শক্তি সরাসরি সামনে আসতে সাহস পায় না, তারা যখন নতুন মোড়কে পুরোনো আদর্শ চাপিয়ে দেয়,তখন সেটি রাজনীতিকে নয়—গণতন্ত্রকে প্রতারণা করে।

জুলাই আন্দোলনের শিক্ষা কি আমরা ভুলে যাচ্ছি?

জুলাই আন্দোলন ছিল স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক প্রতিবাদ।কিন্তু সেই আন্দোলনের মুখগুলো যদি পরে বিভ্রান্তিকর রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠে,তবে প্রশ্ন উঠে—আন্দোলনের আদর্শ কি ব্যবহৃত হলো,নাকি বিক্রি হয়ে গেল?

গণআন্দোলনের শক্তি যদি ক্ষমতার গোপন খেলায় হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে জনগণ আর কোনো আন্দোলনের ওপর আস্থা রাখবে না।

নির্বাচনের ফল নয়,গ্রহণযোগ্যতাই আসল

ইতিহাস বলে—নির্বাচন জেতা যায় কৌশলে,কিন্তু শাসনের বৈধতা আসে গ্রহণযোগ্যতা থেকে।একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের ফলাফল যত বড়ই হোক,তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে।

আজ যারা মনে করছেন,প্রশাসনিক কৌশলে এক পক্ষকে ঠেকিয়ে দেওয়া যাবে—তাদের মনে রাখা উচিত,ভোটাধিকার হরণ করলে তার প্রতিক্রিয়া রাজপথে ফিরে আসে।

শেষ কথা

এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের সামনে একটিই পথ খোলা—

প্রশাসনকে দৃশ্যমানভাবে নিরপেক্ষ করা

নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া

এবং রাজনৈতিক কুটচাল থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দূরে রাখা

নইলে এই নির্বাচন ইতিহাসে স্মরণীয় হবে ফলাফলের জন্য নয়,বরং একটি প্রশ্নে—

এটি কি জনগণের ভোট ছিল,নাকি রাষ্ট্রযন্ত্রের কারসাজি?

আরও খবর

Sponsered content