প্রতিনিধি ২ জানুয়ারি ২০২৬ , ৮:১৯:২০ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান একটি বহুল আলোচিত নাম। সাম্প্রতিক নির্বাচনী হলফনামায় তিনি দাবি করেছেন—(ক) নিজের নামে কোনো বাড়ি বা স্থাবর সম্পত্তি নেই এবং (খ) তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ৭৭টি মামলায় তিনি খালাসপ্রাপ্ত।এই দুটি দাবির আইনি বৈধতা, সামাজিক প্রভাব,সাংবিধানিক অবস্থান,জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানী বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

১. হলফনামার আইনি কাঠামো ও প্রযোজ্য আইন
১.১ প্রাসঙ্গিক আইন ও বিধান
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ,১৯৭২ (RPO): ধারা ১২, ১৭ ও সংশ্লিষ্ট বিধিতে প্রার্থীর সম্পদ,দায় ও মামলার তথ্য নির্ভুলভাবে ঘোষণা বাধ্যতামূলক।
দণ্ডবিধি,১৮৬০: মিথ্যা হলফনামা দাখিল করলে ধারা ১৯১–১৯৩ (মিথ্যা সাক্ষ্য ও শপথভঙ্গ) প্রযোজ্য হতে পারে।
ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC): খালাসের ধরন (সম্মানজনক খালাস বনাম প্রযুক্তিগত খালাস) আইনি ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন বিধিমালা: তথ্য গোপন বা বিভ্রান্তিকর হলে মনোনয়ন বাতিলের সুযোগ।
১.২ ‘খালাস’ শব্দের আইনি ব্যাখ্যা
সম্মানজনক খালাস (Honourable Acquittal): অভিযোগ প্রমাণিত না হলে।
প্রযুক্তিগত খালাস: সাক্ষ্য ঘাটতি, মামলার ত্রুটি বা প্রক্রিয়াগত কারণে।
> অনুসন্ধানী প্রশ্ন: ৭৭ মামলার প্রতিটিতে খালাসের ধরন কী? কোনো মামলায় আপিল/রিভিশন চলমান কি না?
২. সম্পদ বিবরণ: ‘নিজের নামে বাড়ি নেই’—আইনি ও বাস্তবতা
২.১ আইনি দৃষ্টিভঙ্গি
আইন অনুযায়ী নিজের নামে নিবন্ধিত সম্পত্তি ঘোষণা বাধ্যতামূলক।
স্ত্রী,সন্তান,ট্রাস্ট বা বেনামিতে থাকা সম্পত্তি পরোক্ষ স্বার্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
২.২ অনুসন্ধানী সূচক
ভূমি রেকর্ড (RS, CS, SA, BRS)
সাব-রেজিস্ট্রি দলিল
আয়কর নথি ও ব্যাংক লেনদেন
বিদেশে সম্পত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের রেকর্ড
> মূল প্রশ্ন: ‘নিজের নামে নেই’—এই বক্তব্য কি আইনের ফাঁক ব্যবহার করে বাস্তব সম্পদের অস্তিত্ব আড়াল করছে?
৩. সাংবিধানিক বিশ্লেষণ
৩.১ সংবিধানের আলোকে যোগ্যতা
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬: সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা।
ফৌজদারি দণ্ডিত হলে অযোগ্যতা,কিন্তু খালাসপ্রাপ্ত হলে যোগ্যতা পুনর্বহাল।
৩.২ নৈতিকতা বনাম বৈধতা
সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও নৈতিক প্রশ্ন থেকেই যায়—জনপ্রতিনিধির স্বচ্ছতা কতটা নিশ্চিত?
৪. সামাজিক প্রভাব ও জনমত
৪.১ সমর্থক দৃষ্টিভঙ্গি
‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলা’—খালাস মানে নির্দোষ প্রমাণ।
সম্পদ না থাকার ঘোষণা ‘সাধারণ মানুষের রাজনীতি’র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন।
৪.২ সমালোচক দৃষ্টিভঙ্গি
দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রেক্ষাপটে সম্পদশূন্যতার দাবি অবিশ্বাস্য।
খালাসের ধরন নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব।
৫. জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ
শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অতীত সন্ত্রাস, দুর্নীতি বা রাষ্ট্রবিরোধী অভিযোগ থাকলে তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মূল্যায়নে প্রাসঙ্গিক।
খালাসের পরও গোয়েন্দা সংস্থার ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ চলমান থাকতে পারে।
৬. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক প্রভাব
বিদেশে অবস্থানরত রাজনৈতিক নেতার আইনি অবস্থান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনীতিতে প্রভাব ফেলে।
মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশি রাষ্ট্রগুলো ‘ডিউ প্রসেস’ অনুসরণ হয়েছে কি না—সেদিকে নজর রাখে।
৭. অনুসন্ধানী প্রশ্নমালা (Fact-Check Roadmap)
1. ৭৭ মামলার পূর্ণ তালিকা ও রায়ের কপি কি প্রকাশিত?
2. কোনো মামলায় কি আপিল বা পুনর্বিচারাধীন?
3. দেশে-বিদেশে পরিবারের নামে সম্পদের সঙ্গে তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ সংযোগ আছে কি?
4. আয়কর রিটার্নে ঘোষিত আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি?
উপসংহার
হলফনামায় তারেক রহমানের ‘নিজের নামে বাড়ি নেই’ ও ‘৭৭ মামলায় খালাস’—আইনগতভাবে সম্ভব হলেও তা চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণে কেবল ঘোষণাই যথেষ্ট নয়।প্রয়োজন মামলার রায় বিশ্লেষণ,সম্পদ অনুসন্ধান ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ।গণতন্ত্রে আইন শুধু বৈধতা নয়,আস্থার ভিত্তি—আর সেই আস্থা টিকিয়ে রাখতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থার বিকল্প নেই।














