মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনী বাস্তবতা আবারও একটি পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—সংসদ কি কেবল আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিফলন হবে, নাকি ভোটারের প্রকৃত মতামতের? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,ভোটের ব্যবধান খুব সামান্য হলেও আসনের ব্যবধান হয়েছে বিপুল। এখানেই দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation – PR) পদ্ধতির আলোচনা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংখ্যার অমিল: ভোট কাছাকাছি, আসন দূর আকাশে
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী—
বিএনপি জোট: ৪৬.৬% ভোট → ২১২ আসন
জামায়াত জোট: ৪৩.৯% ভোট → ৭৭ আসন
দুই জোটের ভোটের পার্থক্য মাত্র ২.৭%, কিন্তু আসনের পার্থক্য ১৩৫টি। অর্থাৎ বর্তমান একক-আসনভিত্তিক (First-Past-The-Post) ব্যবস্থায় সামান্য ভোট ব্যবধান সংসদে বিশাল ক্ষমতার ব্যবধানে রূপ নেয়।
এর ফলে লাখ লাখ ভোট কার্যত “অপ্রতিফলিত ভোট” হয়ে যায়। যেমন—
মাত্র ৭০ ভোটে হার মানেই পুরো এলাকার প্রায় অর্ধেক ভোটারের মত সংসদে অনুপস্থিত।
জামায়াত জোট প্রায় ৫৩টি আসনে অল্প ব্যবধানে পরাজিত, যেখানে কোটি ভোটারের মতামত সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব পায়নি।
যদি পিআর পদ্ধতি কার্যকর হতো
ধরা যাক,একই ভোট শতাংশে পুরো সংসদ বা উচ্চকক্ষ PR পদ্ধতিতে গঠিত হতো—
বিএনপি জোট ≈ ১৪১ আসন
জামায়াত জোট ≈ ১৩২ আসন
ছোট দল ও স্বতন্ত্ররা হতো ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি
অর্থাৎ একক আধিপত্যের পরিবর্তে তৈরি হতো সমঝোতাভিত্তিক সংসদ।
আর যদি ১০০ আসনের একটি উচ্চকক্ষ PR পদ্ধতিতে গঠিত হয়, তাহলে আনুমানিকভাবে—
বিএনপি ≈ ৪৭ সদস্য
জামায়াত ≈ ৪৪ সদস্য
পার্থক্য মাত্র ৩ জন
এমন সংসদে কোনো বিল পাশ করতে হলে প্রকৃত বিতর্ক, আলোচনা ও রাজনৈতিক সমঝোতা অপরিহার্য হয়ে উঠত।
উচ্চকক্ষের আরেকটি বড় সুবিধা
PR পদ্ধতি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে—
✅ নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে হারা অভিজ্ঞ নেতারা সংসদে আসতে পারবেন
✅ বুদ্ধিজীবী, নীতি-নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব
✅ ছোট দলগুলো জাতীয় রাজনীতিতে কণ্ঠস্বর পাবে
আজকের বাস্তবতায় যেখানে প্রতিটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের ভোট প্রায় কাছাকাছি,সেখানে উচ্চকক্ষ কার্যত রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
দুর্বল সরকার—নাকি শক্তিশালী গণতন্ত্র?
পিআর পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির দীর্ঘদিনের আশঙ্কা ছিল—এতে সরকার দুর্বল হয়,জোট ভেঙে যায়।বিশ্ব রাজনীতিতে এমন উদাহরণ আছে সত্যি।তবে অন্য বাস্তবতাও রয়েছে:
একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়,
কিন্তু সমঝোতাভিত্তিক সংসদ দীর্ঘমেয়াদে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি তৈরি করে।
প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি দ্রুত সিদ্ধান্তের রাষ্ট্র হবে, নাকি অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের রাষ্ট্র?
প্রজন্মের রাজনীতি: আরেকটি নতুন সমীকরণ
বর্তমান সংসদে বিএনপির বড় অংশ প্রবীণ নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করছে,অন্যদিকে জামায়াত জোট থেকে উঠে এসেছে তুলনামূলক নবীন ও ছাত্ররাজনীতি থেকে আসা নেতৃত্ব। উচ্চকক্ষ চালু হলে এই দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক দর্শনের সংঘাত ও সংলাপ—দুটিই সংসদকে আরও প্রাণবন্ত করতে পারে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির মূল সংকট এখন বিশ্বাসযোগ্যতা নয় শুধু, প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য।ভোটার যদি দেখে তার ভোট সংসদে প্রতিফলিত হচ্ছে না,তাহলে গণতন্ত্র সংখ্যার খেলায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
দ্বিকক্ষ সংসদ ও PR পদ্ধতি হয়তো সব সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু এটি ক্ষমতার একচেটিয়াত্ব কমিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে নীতিনির্ভর করতে পারে।
প্রশ্ন এখন একটাই—বাংলাদেশ কি সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতন্ত্রে থাকবে,নাকি প্রতিনিধিত্বের গণতন্ত্রের দিকে এগোবে?
![]()











































সর্বশেষ সংবাদ :———