জাতীয়

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি: ন্যায়বিচার না রাজনৈতিক বৈধতা?

  প্রতিনিধি ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ , ৬:৪০:৩৮ প্রিন্ট সংস্করণ

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি: ন্যায়বিচার না রাজনৈতিক বৈধতা?

অনুসন্ধান ডেস্ক।।‘জুলাই যোদ্ধাদের’ দায়মুক্তি দেওয়া হবে কি না—এই প্রশ্নটি এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।একদিকে উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য প্রকাশ্যে দায়মুক্তির পক্ষে মত দিচ্ছেন,অন্যদিকে আইনবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা একে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের পরিপন্থী বলে সতর্ক করছেন।

এই বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায়।হবিগঞ্জে থানার ভেতরে বসে এক সমন্বয়কের পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া এবং ঢাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগে আরেক সমন্বয়কের গ্রেপ্তারের পর ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ সংঘটনের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে।

এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার আইন,বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে বলেন,“জুলাই যোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তারা যে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম করেছে,তার জন্য তাদের দায়মুক্তি দেওয়ার আইন প্রণয়ন প্রয়োজন।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন,সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির আইনি ভিত্তি রয়েছে এবং ১৯৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইনের উদাহরণও টানেন।

মুক্তিযুদ্ধ বনাম জুলাই আন্দোলন: তুলনা কি গ্রহণযোগ্য?

তবে এই তুলনাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন,এই দুই ঘটনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

তার ভাষায়,
“১৯৭১ সালে লড়াই ছিল বিদেশি দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে।আর জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল দেশের ভেতরে একটি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন। এই দুই বাস্তবতাকে এক পাল্লায় মাপা যায় না।”

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন,দায়মুক্তির ধারণাটির নৈতিক ভিত্তি নিয়েও—“আপনি যদি দায়মুক্তি চান,তাহলে আগে তো স্বীকার করতে হবে কী অপরাধ করেছেন।খুন,লুট,থানা জ্বালানো—এসবের জন্য আগাম দায়মুক্তি চাওয়া ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”

বিচার ছাড়াই দায়মুক্তি: ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা?

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকও মনে করেন,বিচার ছাড়াই দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিহাসে ভালোভাবে দেখা হবে না।

তার মতে,“এখন হয়তো আবেগ প্রবল। কিন্তু ১০ বা ১৫ বছর পর মানুষ প্রশ্ন তুলবে—যদি হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা ঘটে থাকে,তবে সেগুলোর বিচার হলো না কেন? কেন একটি গোষ্ঠীকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হলো?”

তিনি সতর্ক করে বলেন,দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভবিষ্যতে যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে সহিংসতাকে উৎসাহিত করতে পারে,কারণ তখন বার্তা যাবে—ক্ষমতার পালাবদল হলে অপরাধের বিচার নাও হতে পারে।

সংবিধান ও আইনের শাসন: কোথায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র?

সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ সংসদকে বিশেষ পরিস্থিতিতে দায়মুক্তির আইন করার ক্ষমতা দিলেও,আইন বিশেষজ্ঞদের মতে এটি কোনো স্বয়ংক্রিয় বা সীমাহীন অধিকার নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী,হত্যা,নির্যাতন বা গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে blanket immunity বা সামগ্রিক দায়মুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা,‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়কে যদি অপরাধ থেকে রেহাই পাওয়ার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়,তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দুর্বল হবে এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে।

উপসংহার

জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—এ নিয়ে দ্বিমত নেই।কিন্তু সেই আন্দোলনের নাম ব্যবহার করে অপরাধকে বৈধতা দেওয়া কিংবা বিচার ছাড়াই দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো ও নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

প্রশ্ন এখন একটাই:
রাষ্ট্র কি আবেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে ন্যায়বিচারকে ছাড় দেবে,নাকি আইন ও বিচারের মানদণ্ডেই সব নাগরিককে—‘যোদ্ধা’ হোক বা সাধারণ মানুষ—সমানভাবে বিচার করবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ভবিষ্যৎ।

আরও খবর

Sponsered content