প্রতিনিধি ৩ জানুয়ারি ২০২৬ , ৪:০৯:৪৭ প্রিন্ট সংস্করণ
মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতি একটি শক্তিশালী সামাজিক বাস্তবতা।কিন্তু ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই প্রকাশ্যে থানার ভেতর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ওপর হামলা,হুমকি ও অপমান—এভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি।সাম্প্রতিক সময়ে ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে,তা কেবল রাজনৈতিক বিচ্যুতি নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।

নিজেদের ‘জুলাই চেতনা’র বাহক হিসেবে পরিচয় দেওয়া একটি অংশ প্রকাশ্যে মব সৃষ্টি,ভয়ভীতি,ভাঙচুর ও মামলা বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছে—এমন অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়।তারা নিজেদের মজলুম দাবি করলেও বাস্তবতায় বহু ক্ষেত্রে তারাই নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই দ্বিচারিতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।
আইনি বাস্তবতা ও সংবিধানিক সীমা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগ হবে সংবিধান ও আইনের অধীন।কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ‘চেতনা’র নামে আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান নিতে পারে না।
সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়।মব সহিংসতা,বেআইনি গ্রেপ্তার, ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ড—এই মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। একই সঙ্গে ২৭ অনুচ্ছেদের সমতার নীতিও ভেঙে পড়ে,যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অপরাধের দায়মুক্তি প্রত্যাশা করা হয়।
দণ্ডবিধি ও বিশেষ আইনের আলোকে অপরাধ
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী—
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি,১৮৬০ অনুযায়ী বেআইনি সমাবেশ (ধারা ১৪১),দাঙ্গা (ধারা ১৪৬),সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা (ধারা ১৮৬),গুরুতর আঘাত (ধারা ৩২৫/৩২৬) ও হত্যাকাণ্ড (ধারা ৩০২) সুস্পষ্ট অপরাধ।
ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) অনুসারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাধা দেওয়া বা হুমকি দেওয়া রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার শামিল।
বিশেষ ক্ষমতা আইন,সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন—এসব আইনের আওতায় সংগঠিত সহিংসতা, ভয়ভীতি ও উসকানি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য।
আইনের দৃষ্টিতে ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধ প্রতিশোধের কোনো বৈধতা নেই।সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায়ে স্পষ্ট করেছে—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ,রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে।
মামলা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্য
সাম্প্রতিক সময়ে মামলা তদবিরকে কেন্দ্র করে হঠাৎ অর্থনৈতিক উত্থানের অভিযোগ সমাজে গভীর প্রশ্ন তুলছে। টাকার উৎস অস্বচ্ছ হলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী তদন্ত অপরিহার্য। অন্যথায় অপরাধ লাভজনক হয়ে ওঠে,যা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।
রাষ্ট্রের দায় ও করণীয়
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তিনটি স্তরে স্পষ্ট— ১. নির্বিচার আইন প্রয়োগ: রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা।
২. মব সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে আইন প্রয়োগে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া।
৩. গণতান্ত্রিক রাজনীতির পুনর্গঠন: ছাত্ররাজনীতিকে সহিংসতা ও অর্থলোভমুক্ত করে নীতি ও আদর্শভিত্তিক ধারায় ফিরিয়ে আনা।
উপসংহার
কোনো ‘চেতনা’ই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।যারা নিজেদের মজলুম পরিচয়ে রাষ্ট্রের ওপর জুলুম চালায়,তারা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের শত্রুতে পরিণত হয়।৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাবলি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—আইনের শাসন দুর্বল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।
এখন সময় আবেগ নয়,আইনের।সময় পক্ষপাত নয়, ন্যায়বিচারের।রাষ্ট্র যদি এই চ্যালেঞ্জে ব্যর্থ হয়,তবে ক্ষতি শুধু বর্তমানের নয়—ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও তার মূল্য দিতে হবে।

















