প্রতিনিধি ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ , ২:৫৩:৫৪ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্ভাব্য রাজনৈতিক জোট নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন এক গভীর আদর্শিক ও রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে।দলটির শীর্ষ নেতাদের অতীতের জামায়াতবিরোধী বক্তব্য,রাজনৈতিক অবস্থান ও বিশ্লেষণ নতুন করে সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে—এনসিপি কি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে কেবল নির্বাচনী সমীকরণে প্রবেশ করতে যাচ্ছে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,জামায়াতের সঙ্গে জোটে গেলে এনসিপিকে কঠিন রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।কারণ বর্তমান বাস্তবতায় বৃহত্তম তিনটি ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া মানে এনসিপির জন্য রাজনৈতিকভাবে ‘সব কুল হারানোর’ ঝুঁকি তৈরি হওয়া। অনেকের মতে,এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে এনসিপির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ও গ্রহণযোগ্য অবস্থান গড়ে ওঠার সুযোগ ছিল।
পুরোনো বক্তব্যই এখন বড় প্রশ্ন
অনুসন্ধানে দেখা গেছে,এনসিপির একাধিক শীর্ষ নেতা অতীতে প্রকাশ্যে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি, চরিত্র ও ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন।এসব বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক সমালোচনাই নয়,বরং দলটির আদর্শিক অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এক বক্তব্যে সরাসরি বলেন,
“জামায়াতকে বলবো ভণ্ডামি বাদ দেন।আপনাদের মনে এক, অন্তরে আরেক।”
এই বক্তব্যে জামায়াতের দ্বিচারিতা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে স্পষ্ট অভিযোগ তোলা হয়।
এনসিপি নেতা হান্নান মাসউদ জামায়াতের রাজনৈতিক কার্যক্রমকে স্বৈরশাসনকালীন রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করে বলেন,
“জামায়াতের কার্যক্রম এরশাদের মতো।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,এই তুলনা জামায়াতের আন্দোলন ও কৌশলকে গণতান্ত্রিক ধারার বাইরে রাখার ইঙ্গিত দেয়।
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন,
“জামায়াত কোনো গণমানুষের দল নয়।জামায়াত এবং আওয়ামী লীগ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।”
তিনি আরও বলেন,“জামায়াত আদৌ কোনো ইসলামী দল কি না—তা সঠিকভাবে জানি না,মনেও হয় না।”
সবচেয়ে কড়া মন্তব্য আসে এনসিপি নেতা সারোয়ার তুষার-এর কাছ থেকে।তিনি বলেন,“জামায়াত ইসলামিক দল নয়,এটি একটি জঙ্গি সংগঠন।”এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং এখন তা নতুন করে সামনে আসছে।
এছাড়া এনসিপির আরেক নেতা নাহিদ ইসলাম জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মন্তব্য করে বলেন,“জামায়াতে ইসলামীর পিআর পদ্ধতির আন্দোলন একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতারণা।”
তাহলে জোট কেন?
অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে উঠে আসছে,এসব প্রকাশ্য ও নথিভুক্ত বক্তব্যের পরও জামায়াতের সঙ্গে জোটের আলোচনা শুরু হওয়ায় এনসিপির ভেতরেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।দলীয় সূত্রগুলো বলছে,নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করছে—স্বল্পমেয়াদি আসন সমঝোতার জন্য আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসা ভবিষ্যতে দলটির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন,
“যে দল নিজেরাই জামায়াতকে গণতন্ত্রবিরোধী,প্রতারণামূলক বা সহিংস রাজনীতির ধারক হিসেবে চিহ্নিত করেছে,সেই দল যদি এখন তাদের সঙ্গেই জোটে যায়—তাহলে জনগণ প্রশ্ন করবেই। এটি কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।”
বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় এনসিপি
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে,এনসিপির সামনে এখন দুটি স্পষ্ট পথ—
একটি হলো,অতীত অবস্থান ও আদর্শ ধরে রেখে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়া;
অন্যটি হলো,স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের আশায় এমন একটি দলের সঙ্গে জোটে যাওয়া,যাদের সম্পর্কে নিজেরাই অতীতে সবচেয়ে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে।
এ বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি।তবে অনুসন্ধানী সূত্রগুলো বলছে,আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত-জোট প্রশ্নটি এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে,এই সিদ্ধান্ত শুধু নির্বাচনী ফল নয়—এনসিপির আদর্শ,গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে।
















