সারাদেশ

চট্টগ্রাম মহানগরে ৩৩০ জনকে বহিষ্কার—কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না কি নাগরিক অধিকার সংকোচন?

  প্রতিনিধি ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ৩:২৬:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম মহানগরে ৩৩০ জনকে বহিষ্কার—কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না কি নাগরিক অধিকার সংকোচন?

চট্টগ্রাম ব্যুরো।।চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ১৯৭৮ সালের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ৪০, ৪১ ও ৪৩ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে মহানগর এলাকা থেকে ৩৩০ জন কথিত দুষ্কৃতিকারীকে বহিষ্কার করেছে।একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের নগরীতে প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

⚖️ আইনি বিশ্লেষণ

আইনগত ভিত্তি: সিএমপি অধ্যাদেশের উল্লিখিত ধারাগুলো পুলিশকে প্রিভেন্টিভ অ্যাকশন নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।

বিতর্কের জায়গা:

বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আদালতের দণ্ডাদেশ বা বিচারিক প্রক্রিয়ার উল্লেখ নেই।

একযোগে ৩৩০ জনকে বহিষ্কার সমষ্টিগত শাস্তির (collective punishment) প্রশ্ন তোলে।

আইনি ঝুঁকি: হাইকোর্টে রিট হলে আদেশের যৌক্তিকতা ও তালিকা প্রস্তুত প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

🏛️ সাংবিধানিক স্বাধীনতা

বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে—

ধারা ৩৬: নাগরিকের চলাচলের স্বাধীনতা

ধারা ৩১ ও ৩২: আইনের আশ্রয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা

➡️ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া বহিষ্কার এই মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মানবাধিকার আইনজীবীরা মত দিচ্ছেন।

🗳️ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

নির্বাচন-পূর্ব বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এমন পদক্ষেপকে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হিসেবে দেখছেন।

আশঙ্কা রয়েছে—

রাজনৈতিক কর্মী বা বিরোধী মতাবলম্বীরাও “দুষ্কৃতিকারী” তালিকায় পড়তে পারেন।

সরকারপক্ষের যুক্তি: “অপরাধ দমন ও নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।”

👥 সামাজিক প্রভাব

ইতিবাচক দিক: সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়তে পারে।

নেতিবাচক দিক:

বহিষ্কৃতদের পরিবার সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পুনর্বাসন বা সংশোধনের কোনো দিকনির্দেশনা নেই, যা অপরাধ পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ায়।

💰 অর্থনৈতিক প্রভাব

অনেক বহিষ্কৃত ব্যক্তি যদি শ্রমজীবী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হন, তবে—

তাদের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নগরের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়তে পারে।

অপরদিকে, আইনশৃঙ্খলা উন্নত হলে ব্যবসা ও বিনিয়োগে আস্থা বাড়তে পারে—এটাই প্রশাসনের যুক্তি।

🌍 আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবাধিকার দৃষ্টিভঙ্গি

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সাধারণত—

Due process ছাড়া নির্বাসন বা বহিষ্কারকে নেতিবাচকভাবে দেখে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের আলোকে—

এই ধরনের প্রশাসনিক আদেশ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।

🛡️ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিশ্লেষণ

স্বল্পমেয়াদি লাভ: তাৎক্ষণিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতি হ্রাস।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি:

অপরাধীরা আশপাশের জেলা বা অঞ্চলে সরে গিয়ে অপরাধ বিস্তার করতে পারে।

গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক, লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানের বদলে গণবহিষ্কার কার্যকর কি না—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

🧭 উপসংহার

চট্টগ্রাম মহানগরে ৩৩০ জনকে একযোগে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কঠোর উদ্যোগ হলেও এটি একই সঙ্গে—

সাংবিধানিক অধিকার,

আইনি স্বচ্ছতা,

মানবাধিকার —এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

🔎 বিশেষজ্ঞদের মতে,বিচারিক নজরদারি,পৃথক মূল্যায়ন, আপিলের সুযোগ এবং পুনর্বাসন নীতিমালা যুক্ত না হলে এ ধরনের পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও ন্যায়সঙ্গত হবে না।

আরও খবর

Sponsered content