মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, নদীপথ এবং সামুদ্রিক সীমানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এই আধাসামরিক বাহিনীর মূল লক্ষ্য “Guardian at Sea” বা সমুদ্রের অভিভাবক হিসেবে দেশের সামুদ্রিক সম্পদ ও উপকূলীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। উপকূলীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা,জলদস্যুতা দমন,মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধ,অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান (SAR), প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা—এসবই কোস্ট গার্ডের মৌলিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড আইন,২০১৬–এ বাহিনীর কার্যক্রম ও ক্ষমতার স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী কোস্ট গার্ডের প্রধান দায়িত্ব হলো উপকূলীয় ও সামুদ্রিক এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা,চোরাচালান প্রতিরোধ, জলদস্যুতা দমন এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ।একই আইনের ধারা ৮-এ বলা হয়েছে,প্রয়োজনবোধে কোস্ট গার্ড সদস্যরা সন্দেহভাজন জাহাজ,নৌযান বা ব্যক্তিকে তল্লাশি করতে এবং আটক করতে পারবেন,তবে তা অবশ্যই আইনের নির্ধারিত পদ্ধতি ও এখতিয়ারের মধ্যে থাকতে হবে।
আইনের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট যে,কোস্ট গার্ডের কার্যক্রম মূলত উপকূলীয় এলাকা,সমুদ্রসীমা ও নদীপথকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়ার কথা।স্থলভাগে সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা বা কাউকে আটক করার ক্ষেত্রে সাধারণত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি এবং আইনগত অনুমোদন জরুরি বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মত দেন।এ কারণে যখন কোনো বাহিনী তাদের নির্ধারিত কার্যপরিধির বাইরে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে,তখন তা স্বাভাবিকভাবেই আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ভোলা ও বরিশাল অঞ্চলে কোস্ট গার্ডের কিছু অভিযানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে,সন্ত্রাস দমন বা বিশেষ অভিযানের নামে স্থলপথে শহর ও গ্রাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিরীহ মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ,আটক বা হয়রানি করা হচ্ছে।এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম যদি আইনের সীমা অতিক্রম করে,তবে তা নাগরিক অধিকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করেছে।সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,আইনের আশ্রয় পাওয়া এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়া কারও স্বাধীনতা বা জীবন হরণ করা যাবে না।একইভাবে ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তার ও আটক সংক্রান্ত নাগরিকের অধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে,যেখানে বলা হয়েছে—গ্রেপ্তারের কারণ দ্রুত জানানো এবং আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও একটি মৌলিক স্তম্ভ।সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে।২০২২ সালের নভেম্বরে হাইকোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে,সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের “Fearless Watchdog” বা নির্ভীক পাহারাদার।রায়ে আরও বলা হয়,সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় অযথা হয়রানি করা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিপন্থী।
এই রায়ে আদালত এটিও উল্লেখ করেন যে,কোনো সংবাদ নিয়ে অভিযোগ থাকলে সরাসরি আদালতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে যাওয়া উচিত।এর মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং একই সঙ্গে জবাবদিহিতার কাঠামো বজায় রাখার একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ নির্দেশ করা হয়েছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোস্ট গার্ডসহ সব বাহিনী যদি তাদের আইনি এখতিয়ার ও সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করে,তবে তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত করবে, তেমনি নাগরিকদের আস্থাও দৃঢ় করবে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ,তেমনি গুরুত্বপূর্ণ আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা।আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের প্রতিটি কার্যক্রম হতে হবে স্বচ্ছ,আইনসম্মত এবং জবাবদিহিমূলক। কারণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে নিরাপত্তাও টেকসই হয় না।
![]()





















































সর্বশেষ সংবাদ :———