সম্পাদকীয়

কেরানীগঞ্জ কারাগার ও মানবাধিকার: রাষ্ট্রের দায় কোথায়

  প্রতিনিধি ৮ জানুয়ারি ২০২৬ , ৬:৩৭:০১ প্রিন্ট সংস্করণ

কেরানীগঞ্জ কারাগার ও মানবাধিকার: রাষ্ট্রের দায় কোথায়

মাজহারুল ইসলাম।।ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার,কেরানীগঞ্জ থেকে আসা সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো রাষ্ট্র,আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।প্রায় ১৮০০ থেকে ২০০০ বিচারাধীন হাজতিকে টানা ২৪ ঘণ্টা লকআপে রাখা,পর্যাপ্ত খাবার-পানি ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ যদি সত্য হয়,তবে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি একটি গুরুতর সাংবিধানিক ও মানবাধিকার সংকট।

বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে বলেছে,আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।বিচারাধীন হাজতিদের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা আরও জোরালো।তারা অপরাধী নন;তারা কেবল আদালতের রায়ের অপেক্ষায় থাকা নাগরিক।সেই নাগরিকদের প্রতি শাস্তিমূলক আচরণ আইন,ন্যায়বিচার ও সভ্যতার পরিপন্থী।

কারা আইন,১৮৯৪ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী কারাগার কোনো প্রতিশোধের জায়গা নয়; এটি সংশোধন ও মানবিক ব্যবস্থাপনার স্থান।কিন্তু দীর্ঘ সময় সেলবন্দি রাখা,মৌলিক প্রয়োজন অস্বীকার করা এবং সমষ্টিগতভাবে হাজতিদের শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া হলে তা কার্যত ‘সমষ্টিগত দণ্ড’ (Collective Punishment) হিসেবে বিবেচিত হয়—যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাষ্ট্র।জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি (ICCPR) এবং নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয়—বন্দিদের সঙ্গে মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে আচরণ করতে হবে। এসব নীতিমালা লঙ্ঘিত হলে শুধু দেশের ভেতরে নয়,আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো,এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের পরও কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। নীরবতা এখানে কোনো সমাধান নয়; বরং এটি সন্দেহকে আরও গভীর করে।রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগ অস্বীকার করা নয়,বরং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা।

কারাগারের ভেতরে মানবাধিকার রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।আজ যদি হাজতিদের অধিকার পদদলিত হয়,আগামীকাল সেই নজির সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।আইনের শাসন তখন কাগুজে স্লোগানে পরিণত হবে।

এই সম্পাদকীয়ের মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—কারাগারের ভেতরে যা ঘটে,তা কোনো অন্ধকার অধ্যায় নয়। রাষ্ট্রের আলো সেখানে পৌঁছাতেই হবে।অবিলম্বে অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত,২৪ ঘণ্টা লকআপের যৌক্তিকতা প্রকাশ এবং হাজতিদের ন্যূনতম মানবিক অধিকার নিশ্চিত করাই পারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে।অন্যথায়,কেরানীগঞ্জ শুধু একটি কারাগারের নাম নয়—তা হয়ে উঠবে রাষ্ট্রীয় বিবেকের ব্যর্থতার প্রতীক।

আরও খবর

Sponsered content