প্রতিনিধি ২৫ জুন ২০২৪ , ৬:১৮:৩০ প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক।।রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী ও নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকির নামে নরসিংদী,ঢাকা,গাজীপুর,সাভার, নাটোরে রয়েছে শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি।এর মধ্যে নরসিংদীর রায়পুরার মরজাল এলাকায় সামাজিক কবরস্থান দখল করে শতকোটি টাকার ওয়ান্ডার পার্ক (লাকি পার্ক অ্যান্ড রিসোর্ট) গড়ে তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর শত কোটি টাকার ওয়ান্ডার পার্ক গড়ে তুলেছেন সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মতিউর
লায়লা কানিজ লাকি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের হলফনামায় ২৬টি স্থানে এসব সম্পত্তির উল্লেখ করেছেন।তাছাড়াও তার রয়েছে নরসিংদী ও ঢাকায় বিলাসবহুল বাড়ি।চড়েন দামি ব্র্যান্ডের গাড়িতে।হলফনামায় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকার বলে উল্লেখ করলেও,প্রকৃত বাজারমূল্য তার চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি।

তিনি উপজেলা নির্বাচনে তার হলফনামায় স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে যা দেখিয়েছেন: রাজউকের ৫ কাঠার মূল্য ধরা হয়েছে ১৪ লাখ টাকা,সাভারে ৮.৫ কাঠার মূল্য ৫০ হাজার টাকা,গাজীপুরে ৫ কাঠা ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, গাজীপুরের পূবাইলে ৬.৬০ শতাংশ ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা,একই এলাকায় ২.৯০ শতাংশ ১১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা,গাজীপুরের খিলগাঁও এলাকায় ৫ শতাংশ ১২ লাখ ১০ হাজার টাকা,৩৪.৫৫ শতাংশ ৮০ লাখ ১৪ হাজার টাকা, একই জেলার বাহাদুরপুরে ২৭ শতাংশের দাম ২২ লাখ, মেঘদুবীতে ৬.৬০ শতাংশ ১৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকা এবং নাটোরের সিংড়ায় ১৬৬ শতাংশ ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
নিজ জেলা নরসিংদীর মরজালের ওয়ান্ডার পার্কটির ১৩৩.৫০ শতাংশ জায়গার দাম দেখানো হয় ৫৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা,৫.২৫ শতাংশ ১৬ লাখ ৮৮ হাজার টাকা,৮.৭৫ শতাংশ ৩১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।এছাড়াও নরসিংদী ও গাজীপুরের ৯ টি স্থানে ২৭৮.৯৩ শতাংশ জমির উল্লেখ করলেও তিনি তার মূল্য উল্লেখ করেননি।তাছাড়াও তার ব্যাংক একাউন্টে রয়েছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কমিশনার ও কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপীলাত ট্রাইবুন্যালের সদস্য (টেকনিক্যাল) ড. মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজের নামে রাজধানীর বসুন্ধরার ডি ব্লকের ৭/এ রোডের ৩৮৪ নম্বর বাড়িতে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।বসুন্ধরার ডি ব্লকে রয়েছে ৫ কাঠার ৭ তলা বাড়ি।যেখানে মতিউর পরিবার নিয়ে বসবাস করেন।
লাকি নরসিংদীর মরজালে কাজি মো. বশির উচ্চ বিদ্যালয়ের টাকায় নিজ নামে জমি কেনেন।পরে সেই জমি ব্যবহার করে সরকারি টাকায় নিজ বাড়ির মূল ফটক পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করেন।পাশাপাশি ওই সড়কের নামকরণও করেন নিজ নামে।
স্থানীয়রা বলছেন,তার বাবা কফিল উদ্দিন ছিলেন খাদ্য অধিদফতরের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা।বিয়ের পর স্বামী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কমিশনার ড. মতিউর রহমানের অবৈধ টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।প্রভাব খাটিয়ে গত দেড় দশকে জোর করে মানুষের জমি দখল করেছেন। মরজালে সামাজিক কবরস্থান দখল করে শত বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন ‘লাকি পার্ক এন্ড রিসোর্ট’।
শুধু নিজের নামে নয়; মামলা,সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা করে মরজাল এলাকায় ছেলে আহমেদ তৌফিকুর রহমান অর্নব ও মেয়ে ফারজানা রহমান ইস্পিতার নামে রেখেছেন ৫০-৬০ বিঘা জমি।
এ ব্যাপারে রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন বলেন,‘লাকি সরকারি অর্থ ব্যয় করে নিজের বাড়ির জন্য রাস্তা নির্মাণ করেন।আবার সেই সড়ক তার নামে নামকরণও করেন।’
মরজাল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মরজাল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সানজিদা সুলতানা নাছিমা বলেন,লাকি-মতিউর আমার কাছ থেকে ৬ কোটি টাকার জমি ক্রয় করেছেন।আমার স্বামী মোখলেসুর রহমান মোক্তার অসুস্থ থাকা অবস্থায় চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করতে হয়েছিল।আমি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় ও বর্তমানে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে অনেক অভিযোগ পেয়েছি। সুরাহা করার চেষ্টাও করেছি;কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি তার টাকার প্রভাব প্রতিপত্তির কাছে।’
তিনি আরও বলেন,আমার কাছে আসা অভিযোগের মধ্যে পার্কের সামনে আনা মিয়ার জায়গা দখল করে নিয়েছেন। সেটা নিয়ে আদালতে মামলা রয়েছে।মরজাল টেকপাড়ায় লাকির বাড়ির পেছনের জায়গা নওয়াব আলী ডাক্তারের।তার জমিও দখল করে নিয়েছেন।তিনিও মামলা করেছেন।মরজাল ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বজলুর রহমান খানকে কিছু টাকা ধার দিয়ে তার সব জমি জোর করে দখল করে নিয়েছেন।বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানকে আটকিয়ে ৫টি খালি চেক স্বাক্ষর করে নিয়ে রেখেছেন।সেটা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে নিজের সব অপকর্ম করিয়ে নিচ্ছেন।’
মরজাল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. আলতাফ হোসেন বলেন,ওয়ান্ডার পার্কটি প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে।বর্তমান বাজারে মরজাল এলাকায় প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা।আর এই এলাকায় ৩৫ শতাংশে এক বিঘা।সে হিসেবে পার্কের জমির বর্তমান বাজারমূল্য শত কোটি টাকার উপরে।এছাড়া লায়লা কানিজ লাকি ও তার ছেলে-মেয়ের নামে মরজাল বাসস্ট্যান্ডে চায়না প্রজেক্টের পূর্ব পাশে এবং পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে মিলিয়ে ৪০ শতক জমি রয়েছে।এর প্রতি শতাংশ বর্তমান বাজার মল্য ৪৫-৫০ লাখ টাকা।এছাড়া মরজাল ইউনিয়নের ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৫০-৫৫ বিঘা জমি রয়েছে।সেগুলোও ৪-৫ লাখ টাকা শতাংশ।সবমিলিয়ে মরজালে পৌনে ২০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।এছাড়া মরজাল কাজী বশির উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে তার আলিশান বাড়ি রয়েছে।সেটি নির্মাণে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও তিনি জানান।
এই বিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন,আমি অবসর নিয়েছি গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর।অনেক অনিয়ম হয়েছে।কিন্তু কিছুই করার ছিল না। হাত,পা,মুখ বাঁধা ছিল।এব্যাপারে আমি আর কিছু বলতে চাচ্ছি না।’
এ ব্যাপারে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মকবুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কমিশনার ড. মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকি ছিলেন রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।সেখান থেকে অধ্যাপনা ছেড়ে কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর হস্তক্ষেপে ও নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিএম তালেবের সহযোগিতায় ২০২৩ সালে ১৯ জানুয়ারি জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন।
২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুস ছাদেক মারা যাওয়ার পর পদটি শূন্য হয়। পরে নিজেকে উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ঘোষণা দেন। দলীয় মনোনয়নও পান তিনি।পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় দলীয় প্রভাব বিস্তার করে ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে ৬ প্রার্থীকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য করিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন লায়লা কানিজ লাকি।
এদিকে চলতি ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে গত ২৯ মে রায়পুরা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।সেখানে লায়লা কানিজ লাকি রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফেরদৌস কামাল জুয়েলের সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।কিন্তু ২২ মে,উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী সুমন মিয়া মারা যাওয়ায় পরদিন নির্বাচন কমিশন সব পদের নির্বাচন স্থগিত করে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী ও নরসিংদী রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকির সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,আপনারা অনেক কিছু লিখছেন,সেভাবে এটাও লিখেন।এভাবে লিখে ছাপিয়ে দেন।কেন করি না,কি করি না,আপনারাই তো দিয়ে দিছেন সবকিছু।আমার আর কিছু বলার আছে?’ এই কথা বলে লাকি ফোন কেটে দেন।পরে আর কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

















