নিজস্ব প্রতিবেদক।।রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—ক্ষমতার দাবার বোর্ডে সবচেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়ও কখনো নিজের সাজানো চালেই পরাজিত হন।বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনার শাসনকালেও এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত রয়েছে,যা তখন কৌশলগতভাবে নিরাপদ মনে হলেও সময়ের পরিক্রমায় তা তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গভীর সংকট তৈরি করেছে।বিশেষ করে রাষ্ট্রের চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চার ব্যক্তিকে বসানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে এক কঠিন রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির উপাখ্যান।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেন সাবেক প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে।তখন ধারণা করা হয়েছিল,তাঁর নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি সরকারের জন্য একটি নিরাপদ ভারসাম্য তৈরি করবে।কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন পথ দেখায়।নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নেওয়ায় তিনি সরকারের অনেক রাজনৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মেলাননি।২০০১ সালের নির্বাচনের সময় তাঁর ভূমিকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের জন্ম দেয় এবং দলীয় মহলে সেই নিয়োগকে পরে অনেকেই রাজনৈতিক ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে ২০১৫ সালে,যখন সরকার এস কে সিনহাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়।জ্যেষ্ঠতার প্রশ্নে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তাঁর নিয়োগ নিয়ে শুরু থেকেই নানা আলোচনা ছিল।পরবর্তীতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়।সেই রায়ে সরকারের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে যে পর্যবেক্ষণ উঠে আসে,তা রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে।অনেক বিশ্লেষক একে বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে অভূতপূর্ব দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখেছেন।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে আলোচিত হয় ২০২৪ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নিয়োগ।সমালোচকদের মতে,রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত আস্থার ভিত্তিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পরে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।বিশেষ করে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়।অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সেই সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে সেনাবাহিনীর ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে বড় প্রভাব ফেলেছিল।
সবশেষে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি করা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন ওঠে।আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও অভিজ্ঞ নেতাদের পাশ কাটিয়ে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানোর সিদ্ধান্ত দলের ভেতরেও বিস্ময় তৈরি করেছিল। সংকটকালীন সময়ে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থানকে অনেকেই অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থক বলে সমালোচনা করেছেন,যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আস্থা ও কৌশলগত বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। শেখ হাসিনা এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তম্ভে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন,যাদের ওপর তিনি গভীর আস্থা রেখেছিলেন।কিন্তু সময়ের কঠিন পরীক্ষায় সেই আস্থার অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,ক্ষমতার দীর্ঘ পথচলায় কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্তই ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।শেখ হাসিনার এই চারটি নিয়োগও তেমন এক রাজনৈতিক অধ্যায়, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
![]()


















































সর্বশেষ সংবাদ :———