মাজহারুল ইসলাম।।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।বরং অনানুষ্ঠানিক ফলাফল,ভোটার উপস্থিতি এবং ভোটের সম্ভাব্য হিসাব সামনে আসার পর স্পষ্ট হচ্ছে—এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়,বরং বাংলাদেশের ভোট রাজনীতির গভীর সংকেত বহন করছে।
প্রথমেই একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি।বিএনপির ৫৩% ও জামায়াতের ৪০% ভোটের যে আলোচনা চলছে,তা এখনো নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফল নয়; এগুলো নির্বাচনের আগে জরিপ ও রাজনৈতিক অনুমানের প্রতিফলন।অথচ রাজনৈতিক প্রচারণায় এগুলোকে প্রায় চূড়ান্ত গণরায় হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে—যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৫৯.৪৪%।অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার ভোটকেন্দ্রেই যাননি।এখন যদি আলোচিত হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ৫৩% ও জামায়াত ৪০% কাস্ট ভোট পেয়ে থাকে,তাহলে মোট ভোটারের অনুপাতে বিএনপির সমর্থন দাঁড়ায় প্রায় ৩১.৫%, আর জামায়াতের ২৩.৭%।প্রশ্ন হলো—এটিকে কি সত্যিই সর্বজনীন গণরায় বলা যায়?
ইতিহাসের আয়নায় কঠিন সত্য
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনগুলো দেখলে স্পষ্ট হয়—বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপর দাঁড়িয়ে ছিল।ভোটাররা এক পক্ষের বিকল্প হিসেবে অন্য পক্ষকে বেছে নিয়েছে।
কিন্তু এবার দৃশ্যপট ভিন্ন।আওয়ামী লীগ কার্যত প্রতিযোগিতার বাইরে থাকায় অনেকেই ধারণা করেছিলেন বিএনপির ভোট জোয়ার তৈরি হবে।বাস্তবতা বলছে ঠিক উল্টো কথা।
বিগত নির্বাচনের তুলনায় বিএনপির ভোটার সমর্থন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়েনি; বরং মোট ভোটারের অনুপাতে তা সীমিতই রয়ে গেছে।অর্থাৎ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য সহজ বিজয় এনে দিলেও ব্যাপক নতুন জনসমর্থন এনে দিতে পারেনি।
অন্যদিকে জামায়াত—যারা একসময় সীমিত ভোটের দল হিসেবে পরিচিত ছিল—সংগঠিত ভোটব্যাংক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে তাদের প্রভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,সমর্থনের পরিধি আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি কার্যকর হয়েছে।
অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো
এই নির্বাচন কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন সামনে দাঁড় করিয়েছে—
আওয়ামী লীগের ভোট কোথায় গেল?
কেন সেই ভোট সরাসরি বিএনপির দিকে স্থানান্তরিত হলো না?
বড় আসন জয় সত্ত্বেও কেন মোট ভোটারের বড় অংশ নীরব রয়ে গেল?
বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক শূন্যতা মানেই জনসমর্থনের স্থানান্তর নয়।বরং ভোটারদের একটি বড় অংশ বিকল্প না পেলে রাজনীতি থেকেই সরে দাঁড়ায়।
আসনের রাজনীতি বনাম জনসমর্থন
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আসন জেতা সহজ; কিন্তু স্থায়ী জনসমর্থন অর্জন কঠিন।২০২৬ সালের ফলাফল দেখাচ্ছে—ভোটের ভৌগোলিক বণ্টন বিএনপিকে বড় জয় দিয়েছে,কিন্তু সেটি সার্বিক রাজনৈতিক আধিপত্যের নিশ্চয়তা নয়।
ক্ষমতা পাওয়া আর জনগণের আস্থা অর্জন—এই দুই বিষয় এক নয়।
শেষ কথা: বিজয়ের ভেতরের সতর্ক সংকেত
২০২৬ নির্বাচন বিজয়ীদের জন্য যেমন স্বস্তির,তেমনি সতর্কবার্তাও। কারণ ইতিহাস বলছে—বাংলাদেশের ভোটার নীরব থাকলেও স্থায়ীভাবে অনুপস্থিত থাকে না।তারা সুযোগ পেলে আবার রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেয়।
আজকের বড় জয় আগামী দিনের নিশ্চয়তা নয়।বরং এই ফলাফল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি কঠিন বার্তা—জনসমর্থনের শূন্যতা কখনো শুধুই সংখ্যার খেলায় ঢেকে রাখা যায় না।
![]()
















































সর্বশেষ সংবাদ :———