মাজহারুল ইসলাম।।বরিশাল আদালতে সংঘটিত সাম্প্রতিক ঘটনাটি শুধু একটি ফৌজদারি মামলার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার মর্যাদা,আদালতের কর্তৃত্ব এবং আইনের শাসনের ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ।আদালতের এজলাস—যেখানে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের প্রতীক দাঁড়িয়ে থাকে—সেই স্থানেই যদি ভাঙচুর,হুমকি,বিচারককে অপমান এবং বিচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ ওঠে,তবে সেটি নিছক বিশৃঙ্খলা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে গুরুতর আঘাত।
আইনি দৃষ্টিকোণ: অভিযোগের গুরুত্ব কতটা গুরুতর
মামলায় যে ধারাগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে—দ্রুত বিচার আইন ২০০২ এর ৪/৫ ধারা এবং দণ্ডবিধির ১৮৬,১৮৯,১৯০,২২৮ ও ৩৫৩—এসব কোনো সাধারণ ধারা নয়।
ধারা ১৮৬: সরকারি কাজে বাধা প্রদান
ধারা ২২৮: আদালতের কার্যক্রম চলাকালে বিচারকের অবমাননা
ধারা ৩৫৩: সরকারি কর্মচারীর ওপর আক্রমণ বা বলপ্রয়োগ
দ্রুত বিচার আইন: জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ ও আতঙ্ক সৃষ্টির মতো অপরাধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রণীত
অর্থাৎ অভিযোগের সারবস্তু যদি সত্য প্রমাণিত হয়,তাহলে এটি শুধু আদালত অবমাননা নয়,বরং বিচারব্যবস্থাকে জোরপূর্বক অচল করার চেষ্টা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করেছে।আদালতের ভেতরে শক্তি প্রদর্শন বা বিচারককে এজলাস ত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ সেই সাংবিধানিক কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আইনজীবীদের ভূমিকা: অধিকার না অরাজকতা?
আইনজীবীরা আদালতের “অফিসার অব দ্য কোর্ট” — অর্থাৎ তারা বিচারপ্রক্রিয়ার অংশীদার,প্রতিপক্ষ নয়।আদালত বর্জন, প্রতিবাদ বা আন্দোলন আইনজীবীদের সাংগঠনিক অধিকার হতে পারে; কিন্তু এজলাসে ঢুকে শুনানি বন্ধ করা,অন্য আইনজীবীকে বাধা দেওয়া বা বিচারককে লক্ষ্য করে হুমকিমূলক আচরণ কোনোভাবেই পেশাগত স্বাধীনতার আওতায় পড়ে না।
যদি অভিযোগ সত্য হয়,তাহলে এটি পেশাগত নৈতিকতার ভয়াবহ অবক্ষয়।কারণ আইনজীবী যখন আইন ভাঙেন,তখন সাধারণ নাগরিকের কাছে আইনের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে।
বিচার বিভাগের মর্যাদা বনাম প্রভাবের রাজনীতি
বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা দেখা যায়—কিছু ক্ষেত্রে বার রাজনীতি আদালতের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।কিন্তু আদালত কখনোই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জায়গা নয়; আদালত চলে আইন ও যুক্তির ভিত্তিতে,শ্লোগান বা চাপের ভিত্তিতে নয়।
এজলাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বিচার বন্ধ করার সংস্কৃতি যদি প্রশ্রয় পায়,তাহলে আগামী দিনে বিচারকরা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে ভয় পাবেন।এর পরিণতি হবে ভয়াবহ—ন্যায়বিচার নয়,শক্তির বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে।
গ্রেপ্তার ও জামিন প্রশ্নে আইনি বাস্তবতা
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে যে যুক্তি দিয়েছেন—আসামি জামিন পেলে তদন্তে বিঘ্ন ঘটতে পারে—তা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় স্বীকৃত নীতি।বিশেষ করে যেখানে সাক্ষী,আদালত কর্মচারী ও বিচারিক পরিবেশ সরাসরি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সেখানে আদালত সাধারণত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে।
তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে,অভিযোগ প্রমাণের আগ পর্যন্ত প্রত্যেক আসামি আইনের চোখে নির্দোষ।তাই তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ,স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক বা পেশাগত প্রতিহিংসামুক্ত।
রাষ্ট্রের জন্য কঠিন পরীক্ষা
এই ঘটনা এখন রাষ্ট্রের জন্য একটি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন একটাই—আইনের শাসন কি ব্যক্তি,পদ বা পেশার ঊর্ধ্বে থাকবে,নাকি প্রভাবশালী পরিচয় বিচারকে ছাপিয়ে যাবে?
আইনজীবী,পুলিশ,বিচারক—সবাই বিচারব্যবস্থার স্তম্ভ।কিন্তু কোনো স্তম্ভ যদি নিজেই কাঠামো ভাঙতে শুরু করে,তখন রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হয়।আদালতের মর্যাদা রক্ষায় আইন সমানভাবে প্রয়োগ না হলে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শেষ কথা
এজলাস কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়,শক্তি প্রদর্শনের স্থানও নয়।এটি ন্যায়বিচারের পবিত্র ক্ষেত্র।সেখানে বিশৃঙ্খলা মানে শুধু একটি ঘটনার অপরাধ নয়—এটি আইনের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সমান।
এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত,দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা এবং একই সঙ্গে বিচার বিভাগের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা—এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।নইলে আদালতের দরজা খোলা থাকলেও ন্যায়বিচারের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে।
![]()




















































সর্বশেষ সংবাদ :———