নিজস্ব প্রতিবেদক।।জানুয়ারির শুরুতেই শীতে জবুথবু সারা দেশ।দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ঢাকায় তাপমাত্রা ১৫ থেকে ১৩-তে নামতেই শীতে কাঁপছে রাজধানী।গত দুদিনের দিন-রাতের তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,গতকালের ১৫ ডিগ্রি থেকে তাপমাত্রা আজ নেমে এসেছে ১৩ ডিগ্রিতে।অন্যদিকে আবহাওয়া অফিস বলছে,এই তাপমাত্রা আরও এক থেকে দুই ডিগ্রি পর্যন্ত কমতে পারেএমনটি হলে শীতের তীব্রতা আরও বাড়বে।আজ রাজধানীর রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।শীতে সবচেয়ে কষ্টে আছে শ্রমজীবী মানুষ।
এদিকে চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুই থেকে তিনটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে।
রাজধানীতে শীত:-
দুদিন ধরে রাজধানীর আকাশে সূর্যের দেখা পাওয়া যায়নি, কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে।গতকালের তুলনায় ২ ডিগ্রি কমে গেছে তাপমাত্রা।হিমেল বাতাসের সঙ্গে তাপমাত্রা কমায় শীতের প্রকোপ বেড়ে গেছে। তাপমাত্রা আরও সামান্য কমতে পারে।
ডিসেম্বর মাসজুড়ে রাজধানীতে শীত আসা নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করেছেন অনেকে।সেই মশকরার জবাবই দিলো এবার শীত। মঙ্গলবার (৩১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা থেকে হঠাৎ করেই কমতে শুরু করেছে রাজধানীর তাপমাত্রা।একই সঙ্গে হিমেল বাতাসে জবুথবু হয়ে যায় সব।পরদিন বুধবার কনকনে বাতাস বেড়ে যাওয়ায় শীতের অনুভূতি বাড়তে শুরু করে।এর মধ্যে সূর্যের দেখা নেই আজ দুদিন হলো।ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের তাপ মাটিতে না আসায় শীত যেন জেঁকে বসেছে।
ডিসেম্বর মাসের হালকা ঠান্ডা শ্রমজীবী মানুষেরা উপভোগ করেন।শারীরিক পরিশ্রমে ঘাম হয় না।গরমের সেই কষ্টও হয় না।কিন্তু গত দুদিনের শীতে কাবু হয়ে পড়েছেন তারাও।কাজে বের হয়ে কনকনে বাতাসে রিকশা চালাতে পারছেন না চালকরা।
বাংলামোটরে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা রিকশাচালক আক্কাস মোল্লা জানান,হালকা শীতে রিকশা চালাতে আরাম হতো।কিন্তু দুই দিনের শীতে কষ্ট হচ্ছে।হাত-পা জমে যাচ্ছে।মনে হচ্ছে আর নাড়ানো যাবে না।একই অবস্থা অন্য পেশার শ্রমজীবী মানুষদেরও।বায়তুল মোকাররমের সামনে শীতের পোশাক বিক্রি করা আমান বলেন,কাপড় তো গায়ে দিয়েই দাঁড়াই কিন্তু ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে কাপড় বিক্রি করাই তো কঠিন।চা-পানি খেয়ে কাজ করার চেষ্টা করি।
ঢাকার বাইরে শীতের প্রকোপ:-
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কনকনে শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।বৃহস্পতিবার (২ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় চুয়াডাঙ্গা জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে,যা বুধবার ছিল ১১ দশমিক ৮ ডিগ্রি।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান,জেলায় গত ১৫ দিন ধরে তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকলেও নতুন বছরের দ্বিতীয় দিন থেকেই শীতের প্রকোপ বেড়েছে।শৈত্যপ্রবাহের কারণে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষজনের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান,দুদিন ধরে সূর্যের দেখা মিলছে না উত্তরের জেলা দিনাজপুরে।সেই সঙ্গে হিমেল বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধিতে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন এই এলাকার মানুষ। অবস্থানগত কারণেই যেসব জেলায় শীতের প্রকোপ বেশি তার মধ্যে অন্যতম দিনাজপুর।দুই দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রিরও বেশি কমেছে।সেই সঙ্গে বেড়েছে হিমেল বাতাসেরও গতি।ফলে বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ। পাশাপাশি কৃষকরাও রয়েছেন বেশ সমস্যার মধ্যে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান,শীতের দাপট অব্যাহত রয়েছে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে।কনকনে বাতাসে বাড়ছে শীতের অনুভূতি।মঙ্গলবার রাত থেকে ঘন কুয়াশায় ছেয়ে যায় জেলার পথঘাট।রাতভর বৃষ্টির মতো ঝরতে থাকে কুয়াশা।গত কয়েক দিন ধরে জেলায় তাপমাত্রা ১২ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ওঠানামা করছে।কয়েক দিন ধরে ভোর থেকে পঞ্চগড়ে ঘন কুয়াশার কারণে মহাসড়কগুলোতে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।হিমালয় থেকে আসা কনকনে হিমেল হাওয়া শীতের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।শীত থেকে রক্ষা পেতে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করছেন মানুষ।
আবহাওয়া অধিদফতর যা জানালো:-
উপমহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও আশপাশের এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে,এর বর্ধিতাংশ উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ কী বলছেন:-
আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ বলেন,রাজধানীর তাপমাত্রা অন্য এলাকার তুলনায় বেশি হলেও হিমেল বাতাসের কারণে শীতের অনুভূতি বেশি হচ্ছে।এই তাপমাত্রা আরও সামান্য পরিমাণ কমতে পারে।এদিকে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের তাপমাত্রা আরও কিছুটা কমে যেতে পারে বলে তিনি জানান।
এদিকে আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা বলেন,আগামীকাল তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে।তবে তাতে শীতের অনুভূতি কমবে না।একই থাকার সম্ভাবনা আছে।এরপর শনিবার কনকনে এ বাতাস কমে এলে শীতের অনুভূতি কিছুটা কমতে পারে।তিনি বলেন,এই মাসের দশ তারিখের দিকে বছরের প্রথম শৈত্যপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারে দেশ।
আগামী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাস:-
অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে।মধ্য রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে।ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল,অভ্যন্তরীণ নদী পরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।দিনের তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে।ঘন কুয়াশার কারণে সারা দেশের কোথাও কোথাও দিবাভাগে শীতের অনুভূতি বিরাজমান থাকতে পারে।
তাপমাত্রা:-
আজ দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়, ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।ঢাকায় আজ ১৩ দশমিক ৮,যা গতকাল ছিল ১৫; রাজশাহীতে ছিল ১২,আজ ২ ডিগ্রি কমে ১০ দশমিক ৫; রংপুরে কালকেও ১২ দশমিক ৫,আজকেও তাই আছে; ময়মনসিংহে আজ দুই ডিগ্রি কমে ১৩ দশমিক ৫,ছিল ১৫; সিলেটেও ছিল ১৬ দশমিক ২, আজকেও ১৬ দশমিক ২, চট্টগ্রামে আজ ১৬ দশমিক ৫,ছিল ১৫ দশমিক ৭; খুলনায় আজকে দুই ডিগ্রি কমে ১২ দশমিক ৩,যা গতকাল ছিল ১৪ দশমিক ৫; বরিশালে ছিল ১৪ দশমিক ৩,আজকে প্রায় একই ১৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর বাইরে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকা জেলাগুলো হচ্ছে— ঈশ্বরদীতে ১০,দিনাজপুরে ১০ দশমিক ২,বাঘাবাড়ি ও বদলগাছিতে ১০ দশমিক ৪ এবং যশোরে ১০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
প্রসঙ্গত,তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়,৬ দশমিক ১ থেকে ৮ ডিগ্রি হলে মাঝারি আর ৪ দশমিক ১ থেকে ৬ ডিগ্রি হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস:-
দেশে চলতি মাসে তিন থেকে পাঁচটি শৈত্যপ্রবাহের শঙ্কার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কম থাকায় শীতের অনুভূতি বাড়বে।এছাড়া বঙ্গোপসাগরে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টির আশঙ্কাও রয়েছে।দিন ও রাতের তাপমাত্রায় পার্থক্য কম থাকায় চলতি মাসে শীতের অনুভূতি বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়,চলতি মাসে দেশে স্বাভাবিক অপেক্ষা কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে দু-একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে,যার মধ্যে একটি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে।দেশের পশ্চিম,উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দুটি মাঝারি থেকে তীব্র এবং দেশের অন্যত্র তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে।
এ সময় দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি থাকতে পারে।তবে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কম থাকার কারণে শীতের অনুভূতি বাড়বে।













