মাজহারুল ইসলাম।।আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন কে? আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি প্রশাসনিক বিষয় মনে হলেও বাস্তবে এটি সংসদের বৈধতা,সংবিধানের কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
স্পীকার হতে হলে সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে,সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই স্পীকার নির্বাচিত হবেন।অর্থাৎ স্পীকার হওয়ার পূর্বশর্তই হলো সংসদ সদস্য হওয়া।বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইন উপদেষ্টা স্পীকারের দায়িত্ব পালন করবেন—এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে ব্যাখ্যা করা গেলেও সাংবিধানিকভাবে তা টেকসই নয়।কারণ আইন উপদেষ্টা সংসদ সদস্য নন।
ফলে আইন উপদেষ্টা কর্তৃক সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানো হলে সেই শপথের সাংবিধানিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ থাকে।
সংবিধান কি এখনো কার্যকর?
এই বিতর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—বর্তমান সংবিধান কি কার্যকর আছে? বাস্তবতা হলো,সংবিধান কার্যকর না থাকলে রাষ্ট্রপতি কীভাবে ধারাবাহিকভাবে অধ্যাদেশ জারি করছেন? সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা প্রয়োগই প্রমাণ করে যে সংবিধান বহাল আছে এবং কার্যকর রয়েছে।
অতএব,প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে চলার কোনো সুযোগ নেই।
শপথ,তৃতীয় তফসিল ও আইনি শূন্যতা
সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংসদ সদস্যদের শপথের নির্দিষ্ট ফরম্যাট ও কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত আছে।সেখানে আইন উপদেষ্টা কর্তৃক শপথ পাঠ করানোর কোনো বিধান নেই।ফলে প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রপতি কি অধ্যাদেশ দিয়ে তৃতীয় তফসিল সংশোধন করতে পারবেন?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃতীয় তফসিল সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংসদ গঠনের মতো মৌলিক কাঠামো সংশ্লিষ্ট বিষয় অধ্যাদেশ দিয়ে পরিবর্তন করা ‘বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২০০৪ সালের সংশোধনী ও সিইসি প্রসঙ্গ
২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে একটি বিধান যোগ করা হয়—নির্বাচনের পর স্পীকার বা ডেপুটি স্পীকার শপথ পাঠ না করালে তিন দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) শপথ পাঠ করাতে পারবেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখনও তৃতীয় তফসিলে সিইসি কর্তৃক শপথ পাঠ করানোর বিষয়টি যুক্ত করা হয়নি। ফলে এখানে একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে, যা আদালতে গেলে জটিলতা সৃষ্টি করবেই।
স্পীকারের দায়িত্ব হস্তান্তরের বিধান
সংবিধানের ১৪৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পীকার চাইলে শপথ পাঠ করানোর দায়িত্ব অন্য কোনো ব্যক্তির ওপর ন্যস্ত করতে পারেন। এই বিধানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে স্পীকার সাংবিধানিকভাবে প্রধান বিচারপতির মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে শপথ পাঠ করানোর দায়িত্ব দিতে পারেন।
এই ক্ষেত্রে—
কোনো সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন পড়ে না
শপথের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না
রাষ্ট্রীয় রীতি ও ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সও বজায় থাকে
বর্তমান স্পীকার কি এখনো বহাল?
সংবিধানের ৭৪(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন স্পীকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বর্তমান স্পীকার দায়িত্বে বহাল থাকবেন। সেই আলোকে যুক্তি দেওয়া যায়, শিরিন শারমিন চৌধুরী এখনো সাংবিধানিকভাবে স্পীকার হিসেবে বহাল আছেন।
শপথ ছাড়া সংসদ কার্যকর নয়
সংবিধানের ৬৯ ও ১৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ গ্রহণ ও তাতে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। শপথ ছাড়া সংসদে বসা নিষিদ্ধ এবং এর জন্য জরিমানার বিধানও রয়েছে।
উপসংহার
যদি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং তারা সাংবিধানিকভাবে বহাল থাকা স্পীকারের কাছে শপথ গ্রহণ করে, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে শক্ত ও বৈধ পথ। সেই ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক আপত্তি থাকলেও সাংবিধানিকভাবে তা চ্যালেঞ্জ করা প্রায় অসম্ভব হবে।
এই বিতর্ক আসলে কোনো “মজার তত্ত্ব” নয়—এটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের বৈধতা ও সংবিধান মানার পরীক্ষাক্ষণ।
![]()







































Recent Comments