গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন ব্যাংক ৮৫ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা দিয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক।।আমানতের চাপে কোনো কোনো ব্যাংকের ভল্টে টাকা রাখার জায়গা নেই।সীমার বেশি টাকা জমা পড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিচ্ছে এ সব ব্যাংকের অনেক শাখা। প্রতিদিন এ সব টাকা ট্রাক ভরে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন ব্যাংক ৮৫ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা দিয়েছে।

গত ১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে আট হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা জমা হয়েছে।গত ৩০ সেপ্টেম্বর তা ছিল ছয় হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ৮৫ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা জমা হয়েছে।তবে নতুন করে ৮৩ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা ধার নিয়েছে সংকটে থাকা কিছু ব্যাংক।

মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশি গণমাধ্যম কালের কণ্ঠ ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য তুলে ধরা হয়।

হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ব্যাংক খাতের লুটপাটের চিত্র প্রকাশিত হতে শুরু করেছে।এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী সুবিধাভোগীদের লুটপাটের শিকার ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে।ব্যাংক লুটপাটের তথ্য প্রকাশিত হতে শুরু করলে গ্রাহকের টাকা উত্তোলনের চাপ সামাল দিতে পারছে না ডজনখানেক ব্যাংক।তাদের বিভিন্ন উৎস থেকে ধার করে চলতে হচ্ছে।এ ব্যাংকগুলো সরকার পতনের পর কয়েক দিন নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছিল।দৈনিক চাহিদা মেটাতে ধার করেছে অন্য ব্যাংক থেকেও।

তবে গেল দুই সপ্তাহে ব্যাংকগুলো যত টাকা নিয়েছে,তার চেয়ে বেশি জমা করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন,প্রতিটি ব্যাংকের শাখায় ভল্টের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারিত।সীমার বেশি টাকা এলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখায় জমা করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে,বর্তমানে নোটস ইন সার্কুলেশন বা প্রচলনে থাকা টাকার পরিমাণ কমে গত ৩ অক্টোবর তিন লাখ ১০ হাজার কোটিতে নামে।গত ১৫ আগস্ট তা ছিল তিন লাখ ২২ হাজার ৬১ কোটি টাকা।ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে টাকা উত্তোলনের চাপ বেড়েছিল ব্যাংকে।তাই ওই সময় মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বেড়েছিল।সেটি আবারও ব্যাংকিং চ্যানেলে ফেরত আসতে শুরু করেছে।সাধারণত নোটস ইন সার্কুলেশন বা মানুষের হাতে প্রচলিত টাকার পরিমাণ থাকে দুই লাখ ৮০ থেকে ৯০ হাজার কোটি।ব্যাংকের ওপর আস্থা ধীরে ধীরে বাড়লে টাকা আরও ফেরত আসবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান,সার্কুলেশনে থাকা নোটের মধ্যে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সারা দেশে ১১ হাজারের মতো ব্যাংক শাখার ভল্টে ১৬ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো জমা থাকে।সার্কুলেশনে থাকা বাকি টাকা রয়েছে নাগরিকদের পকেট,ঘরের আলমারি,সিন্দুক কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।

জানা গেছে,দুর্নীতিসহ বিভিন্ন উপায়ে অর্জিত অর্থ বিভিন্নভাবে ঘরে রেখেছিলেন অনেকে।তবে সরকার পরিবর্তনের পর তাদের বেশির ভাগ পলাতক।বর্তমানে তাদের কেউ কেউ ঘরে টাকা রেখে বিপদে আছেন।ফলে নিরাপদ বোধ না করায় বিভিন্নভাবে তারা ভালো ব্যাংকে টাকা জমা রাখছেন।

আবার সরকার পতনের পর থেকে বড় অঙ্কের নগদ টাকা তুলতে পারছে না মানুষ।এর কারণ,সরকার পতনের প্রথম সপ্তাহে দিনে সর্বোচ্চ এক লাখ,দ্বিতীয় সপ্তাহে দুই লাখ এবং তৃতীয় সপ্তাহে তিন লাখ টাকা নগদ উত্তোলনের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।এখন অবশ্য সে সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।তার পরও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক থেকে অনেকে বড় অঙ্কের আমানত তুলতে পারছেন না।বিশেষ করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী,গ্লোবাল ইসলামী,বাংলাদেশ কমার্স ও ইউনিয়ন ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের পে-অর্ডার নগদায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন,কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের মতো টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দেবে না।তবে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক মুদ্রা সরবরাহের মাধ্যমে এ সহায়তা নিতে পারে।

জানা গেছে,নামে-বেনামে ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা।নামে-বেনামে টাকা বের করে নেওয়ায় তীব্র তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে ব্যাংকগুলোয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান,অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে যেসব ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়েছে সেগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ব্যবস্থায় তারল্য সহায়তা দিতে যাচ্ছে।এরই মধ্যে এ সব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করা হয়েছে।তবে তারল্য সংকটের কারণে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা আতঙ্কিত হয়ে টাকার জন্য ব্যাংকগুলোতে যাচ্ছেন।টাকা না পাওয়ায় অনেক অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার আত্মগোপনে চলে যান।এরপর গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর।তিনি যোগ দিয়েই ব্যাংক খাতের সংস্কারে মনোযোগ দেন।

  • Related Posts

    শেখ হাসিনার সময়ে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, অন্তর্বর্তী সরকার আমলে মাথাপিছু ঋণের চাপ

    ডেস্ক রিপোর্ট।।বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত দেড় দশকের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দুটি সূচকে স্পষ্ট—একদিকে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মানুষের মাথাপিছু আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে,অন্যদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মাথাপিছু ঋণের বোঝা দ্রুত…

    উন্নয়ন নেই, তবু ঋণ বাড়ছে—বাংলাদেশের বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

    নিজস্ব প্রতিবেদক।।বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বড় কোনো নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন না হলেও রাষ্ট্রীয় ঋণের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।এই বাস্তবতা শুধু অতীত সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের উত্তরাধিকার নয়,বরং বর্তমান…

    You Missed

    শ্রীপুরে ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মামা-ভাগিনা আটক

    • By newadmin
    • ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬
    • 0 views
    শ্রীপুরে ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মামা-ভাগিনা আটক

    নারীদের নেতৃত্ব নিয়ে জামায়াতের অবস্থান: আমীরে জামাতের নামে পোস্ট, হ্যাকিংয়ের দাবি

    • By newadmin
    • ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬
    • 0 views
    নারীদের নেতৃত্ব নিয়ে জামায়াতের অবস্থান: আমীরে জামাতের নামে পোস্ট, হ্যাকিংয়ের দাবি

    তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার আশ্বাস ভাওতাবাজি ও রাজনৈতিক মিথ্যাচার : আ স ম রেজাউল করীম

    • By newadmin
    • ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬
    • 0 views
    তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার আশ্বাস ভাওতাবাজি ও রাজনৈতিক মিথ্যাচার : আ স ম রেজাউল করীম

    বরিশাল-৪ আসনে নির্ধারিত সময়ে শতভাগ ভোটগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন

    • By newadmin
    • জানুয়ারি ৩১, ২০২৬
    • 0 views
    বরিশাল-৪ আসনে নির্ধারিত সময়ে শতভাগ ভোটগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন

    ভোলা–বরিশাল সড়কসহ ২টি বড় সেতু ও ৩৬টি সেতু নির্মাণে দেড় লক্ষ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে দক্ষিণাঞ্চলের নতুন দিগন্ত

    • By newadmin
    • জানুয়ারি ৩১, ২০২৬
    • 0 views
    ভোলা–বরিশাল সড়কসহ ২টি বড় সেতু ও ৩৬টি সেতু নির্মাণে দেড় লক্ষ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে দক্ষিণাঞ্চলের নতুন দিগন্ত

    বাংলাদেশে জামায়াত–সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও দখলবাজির অভিযোগ: একটি সংকলিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন

    • By newadmin
    • জানুয়ারি ৩১, ২০২৬
    • 0 views
    বাংলাদেশে জামায়াত–সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও দখলবাজির অভিযোগ: একটি সংকলিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন