মাজহারুল ইসলাম।। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন বারবার আলোচনায় আসছে—নির্বাসনে বা দেশত্যাগে থাকা কোনো রাজনৈতিক নেতা কি আবার দেশে ফিরে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেন? সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে নানা বক্তব্য,পাল্টা বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ তুলে ধরা হচ্ছে।তবে ইতিহাসকে আবেগ নয়,তথ্যের আলোকে বিচার করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায়,নির্বাসন বা দেশত্যাগ কোনো রাজনৈতিক নেতার রাজনৈতিক জীবনের চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়। বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়,সামরিক,সাংবিধানিক কিংবা গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নেতারা নিজ দেশে ফিরে এসেছেন।
ফ্রান্সের লুই অষ্টাদশ (Louis XVIII) নেপোলিয়নের পতনের পর ১৮১৪ সালে সিংহাসনে ফিরে আসেন।ইংল্যান্ডের চার্লস দ্বিতীয় দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।স্পেনের ফার্দিনান্দ সপ্তম নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পর পুনরায় ক্ষমতায় ফেরেন।আর্জেন্টিনার হুয়ান ডোমিঙ্গো পেরন (Juan Perón) ১৮ বছরের নির্বাসন শেষে ১৯৭৩ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।ইরানের আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১৯৭৯ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন।পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করার পর দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেন এবং পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও প্রত্যাবর্তনের নজির রয়েছে।১৯৭১ সালে পাকিস্তানে বন্দিত্ব শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।যদিও এটি প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক নির্বাসন ছিল না,তবুও দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা।
অন্যদিকে ইতিহাসে এমন উদাহরণও কম নয়,যেখানে নির্বাসিত শাসক আর কখনো ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি।ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী,উগান্ডার ইদি আমিন, জিন এল আবিদিন বেন আলী কিংবা আফগানিস্তানের আশরাফ গনির মতো নেতাদের রাজনৈতিক অধ্যায় কার্যত নির্বাসনেই শেষ হয়েছে।
এ থেকেই বোঝা যায়,ইতিহাসের কোনো একক সূত্র নেই। কোনো নেতা ফিরে আসবেন কি না,তা নির্ভর করে জনগণের সমর্থন, সাংবিধানিক কাঠামো,বিচারিক প্রক্রিয়া,রাজনৈতিক সমঝোতা, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং সময়ের বাস্তবতার ওপর।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও একইভাবে জটিল।কোনো ব্যক্তি বা দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়,তেমনি “কখনোই ফিরবে না” বা “অবশ্যই ফিরবে”—এ ধরনের চূড়ান্ত মন্তব্যও ইতিহাসসম্মত নয়।গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণ,আইন এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়।
ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার না বানিয়ে গবেষণা, প্রামাণ্য দলিল ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।কারণ ইতিহাস শুধু অতীতের বিবরণ নয়; এটি বর্তমানকে বোঝার এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিচক্ষণ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সম্পাদকীয় মতামত: ইতিহাস সম্ভাবনার দুয়ার কখনো পুরোপুরি বন্ধ করে না।তবে ইতিহাস কখনোই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না।তাই রাজনৈতিক বিতর্কে আবেগের পরিবর্তে তথ্য,গবেষণা এবং আইনের শাসনকে প্রাধান্য দেওয়াই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
