নিজস্ব প্রতিবেদক।।হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট রায় ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী,পাওনা টাকা আদায় কিংবা যেকোনো ধরণের দেওয়ানি বিরোধ মীমাংসার জন্য থানার অভ্যন্তরে পুলিশের সালিশ বা বিচার পরিচালনা সম্পূর্ণ বেআইনি।
পুলিশ কেবল ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ ও তদন্ত করতে পারে,দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো এখতিয়ার তাদের নেই।অথচ এই আইনি নিষেধাজ্ঞা ও আদালতের কঠোর নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখনো দেশের বিভিন্ন থানায় দেওয়ানি বিরোধের ‘সালিশ-বাণিজ্য’ কিংবা নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি বরিশালের কোতোয়ালি মডেল থানায় ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা এই অবৈধ চর্চা এবং তার আড়ালে থাকা ভয়াবহ অপরাধের চিত্রকে আবারও সামনে এনেছে।এক আবাসন ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে মারধর ও সংবেদনশীল স্থান চেপে ধরে ব্ল্যাঙ্ক চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার পর,বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করার জন্য তাকে জোরপূর্বক থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত পক্ষের বয়ান এবং আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী চিত্র তুলে ধরা হলো।
১. বরিশালের ঘটনা: নির্যাতন থেকে থানা চত্বর (পুরো আপডেট)
বরিশালের ‘অগ্রণী হাউজিং’ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও আবাসন ব্যবসায়ী আবদুল আজিজকে নির্যাতনের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়:
নির্যাতন ও জোরপূর্বক স্বাক্ষর:গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় আবদুল আজিজের অফিসে প্রবেশ করেন মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে লিটু এবং তার সহযোগীরা।সেখানে আজিজকে শারীরিক নির্যাতনের পর প্রথমে একটি ব্ল্যাঙ্ক চেকে এবং পরে আরেকটি চেকে ৭০ লাখ টাকা লিখে সই নেওয়া হয়। এরপর দুই সেট স্ট্যাম্পের (ছয় পাতা) কাগজে জোরপূর্বক স্বাক্ষর ও সিল নেওয়া হয়।
থানায় নিয়ে যাওয়ার চাপ:স্বাক্ষর নেওয়ার পর লিটু ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীকে বলেন,”এখন থানায় চল। সেখানে বসে সালিস হবে।তোর কাছে আমি টাকা পাই।প্রাণভয়ে এবং নিরাপত্তার শংকায় আজিজ থানায় যেতে বাধ্য হন।
থানায় পুলিশের ভূমিকা:কোতোয়ালি থানায় যাওয়ার পর পরিদর্শক (তদন্ত) লুৎফর রহমানের কক্ষে দুই পক্ষ বসে। ওসি মো. আল মামুন উল ইসলাম সে সময় উপস্থিত ছিলেন না।পরিদর্শক লুৎফর জানান,লিখিত অভিযোগ ছাড়া এ ধরণের সালিশ করা অসম্ভব।তবে ওসির বক্তব্য অনুযায়ী,পরবর্তীতে ৫ জুলাই এই ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে থানায় বসে মীমাংসার একটি তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছিল,যদিও লিটু পরে লিখিত অভিযোগ দেননি।
প্রধান আসামি গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের আবেদন:এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি মোস্তাফিজুর রহমান লিটু এবং তার সহযোগী আবুল কালাম আজাদকে ৫ জুলাই (২০২৬) দুপুরে গ্রেপ্তার করে রাতেই আদালতে পাঠানো হয়।
কোতোয়ালি থানার ওসি রিমান্ড আবেদন করা হয়নি বলে জানালেও, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনিরুজ্জামান রাসেল স্পষ্ট করেছেন যে,অধিকতর তদন্তের স্বার্থে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে,যার শুনানি মঙ্গলবার (৭ জুলাই) অনুষ্ঠিত হবে।
২. অভিযুক্তের পরিবারের সংবাদ সম্মেলন ও নেপথ্যের দাবি
ঘটনার পর রোববার (৫ জুলাই) রাতে বরিশাল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধান আসামি মোস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার (লুবনা)। সংবাদ সম্মেলনে তার সাথে গ্রেপ্তার আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী এবং অগ্রণী হাউজিংয়ের পরিচালক মাহাবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।তাদের দাবি:
ব্যবসায়িক পাওনা বনাম চাঁদাবাজি: এটি কোনো রাজনৈতিক বিরোধ বা চাঁদাবাজির ঘটনা নয়।দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক পাওনা প্রায় ১৭ লাখ টাকা আদায় করতে না পেরে ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।
বিনিয়োগ ও প্রতারণার অভিযোগ: মৌসুমী আক্তার দাবি করেন,তার স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান অগ্রণী হাউজিংয়ের পরিচালক ছিলেন এবং সেখানে তার ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ ছিল। লভ্যাংশ ছাড়া মাত্র ১২ লাখ টাকা ফেরত পেলেও বাকি টাকা আজিজ পরিশোধ করেননি।অপর পরিচালক মাহাবুবুর রহমানও ২০১২ সালে ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে কোনো মূলধন বা লাভ পাননি বলে অভিযোগ করেন।এমনকি আবদুল আজিজের বড় ভাইও প্রতারণার শিকার হয়ে আদালতে মামলা করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
৩. আইনের ভাষ্য ও আদালতের নির্দেশনা: কেন পুলিশের সালিশ সম্পূর্ণ বেআইনি?
বরিশালের এই ঘটনায় মোস্তাফিজুর রহমান লিটু যখন ব্যবসায়ী আজিজকে জোরপূর্বক থানায় নিয়ে যান এবং পুলিশ যখন ৫ জুলাই “মীমাংসার কথা” বলে দুই পক্ষকে সময় দেয়—তখনই দেশের প্রচলিত আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার চরম লঙ্ঘন ঘটে।
ক) সালিশে পুলিশের ভূমিকা ও আইনি নিষেধাজ্ঞা
থানা হলো মূলত সাধারণ ডায়েরি (জিডি),ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ এবং তা তদন্তের স্থান। পাওনা টাকা আদায়,জমিজমা বা পারিবারিক সম্পত্তি ভাগাভাগির মতো দেওয়ানি বিষয়গুলো মীমাংসা করার একচ্ছত্র এখতিয়ার দেওয়ানি আদালতের।হাইকোর্ট বিভিন্ন নির্দেশনায় স্পষ্ট করেছেন যে,কোনো থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বা পুলিশ সদস্য থানা চত্বরে কোনো দেওয়ানি মামলার সালিশ করতে পারবেন না।
খ) যুগান্তকারী রীট ও আপিল বিভাগের রায়:
পুলিশ কর্তৃক থানায় সালিশ,বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার (৫৪ ধারা) ও রিমান্ড (১৬৭ ধারা) সংক্রান্ত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর (BLAST, ASK ইত্যাদি) দায়ের করা একটি যুগান্তকারী রিট মামলা রয়েছে (Writ Petition No. 3901/1998)।২০০৩ সালে আপিল বিভাগে আংশিক সংশোধিত হয়ে চূড়ান্ত হওয়া এই রায়ে পুলিশকে তাদের ক্ষমতার পরিধি,নাগরিক অধিকার রক্ষা ও বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কঠোর ও বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।এছাড়াও,বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টের একক বেঞ্চের রায়ে থানার অভ্যন্তরে ‘সালিশ-বাণিজ্য’ বন্ধে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গ) ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভুক্তভোগীর আইনি প্রতিকার:
পুলিশ যদি সালিশ-মীমাংসার নামে কাউকে থানায় আটকে রাখে,হুমকি দেয় কিংবা চাপ সৃষ্টি করে টাকা বা চেকে স্বাক্ষর আদায় করার চেষ্টা করে,তবে তা সরাসরি বেআইনি ও ক্ষমতার অপব্যবহার (Misuse of Power) হিসেবে গণ্য হবে।
প্রতিকার:এমন পরিস্থিতিতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করতে পারেন।
৪. পাওনা টাকা আদায়ের সঠিক ও আইনি পথ:
সংবাদ সম্মেলনে আসামির স্ত্রী মৌসুমী আক্তার যে পাওনা টাকার দাবি করেছেন,সেই টাকা আদায়ের জন্য আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা থানায় সালিশের চেষ্টা করা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।পাওনা টাকা আদায়ের সঠিক আইনি পথগুলো নিম্নরূপ:
Money Suit (অর্থ আদায় মামলা):কোনো ব্যক্তির কাছে আইনসম্মত পাওনা টাকা আদায় করতে হলে থানায় না গিয়ে সরাসরি দেওয়ানি আদালতে ‘Money Suit’ বা টাকা আদায়ের দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে হবে।
NI Act-এর ১৩৮ ধারা (চেক ডিজঅনার):যদি লেনদেনটি চেকের মাধ্যমে হয়ে থাকে এবং চেকটি ব্যাংকে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকার কারণে প্রত্যাখ্যাত (Disonour) হয়,তবে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের (NI Act) ১৩৮ ধারায় ফৌজদারি মামলা করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR): ছোটখাটো বা ব্যবসায়িক বিরোধের ক্ষেত্রে আইন হাতে না তুলে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ,গ্রাম আদালত বা ইউনিয়ন পরিষদকে আইনি কাঠামোর মধ্যে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে সালিশ করা যেতে পারে।
সমাপনী পর্যবেক্ষণ:
বরিশালের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, পাওনা টাকা আদায়ের অজুহাতে একদিকে যেমন মধ্যযুগীয় কায়দায় ব্যবসায়ীকে নির্যাতন করা হয়েছে, অন্যদিকে অপরাধ ঢাকতে বা বৈধতা দিতে ‘থানা সালিশ’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে।পুলিশ যেখানে শুরুতেই ফৌজদারি অপরাধের (মারধর ও জোরপূর্বক সই নেওয়া) জন্য অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা,সেখানে “অভিযোগ দিলে সালিশ করা হবে” বা “মীমাংসার ডেট দেওয়া হয়েছিল” এমন বক্তব্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী। আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে থানাগুলোকে সালিশি কেন্দ্রের চর্চা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা এবং অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
