নিজস্ব প্রতিবেদক।।গ্রামীণ কর্মসংস্থানের মেগা প্রকল্পগুলোতে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্য দিবালোকে ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায়। উপজেলার মেহেন্দিগঞ্জ-বরিশাল সড়ক এবং শ্রীপুর হাইস্কুল হতে চরফেনুয়ার রাস্তার মাথা পর্যন্ত সড়কে শ্রমিক ছাড়াই ভেকু দিয়ে দেদারসে মাটি কাটা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত sreepur high school road.png” নামক একটি স্থিরচিত্রে দেখা যায়, একটি বহুতল বিদ্যালয় ভবনের সামনে (যা স্থানীয়দের মতে শ্রীপুর হাইস্কুল) একটি হলুদ রঙের ক্যাটারপিলার (CAT) ভেকু মেশিন দাঁড়িয়ে আছে এবং তার চারপাশে উৎসুক জনতা ভিড় করে আছে।এই ছবি এবং স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ প্রমাণ করে যে,গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচিতে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ কেড়ে নিয়ে যন্ত্রের ব্যবহারকে নিয়মে পরিণত করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,এটি কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; গত প্রায় ১৮-১৯ বছর ধরে মেহেন্দিগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে টিআর (টেস্ট রিলিফ),কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) ও কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা) প্রকল্পের মাটি কাটার বড় অংশই আইন লঙ্ঘন করে ভেকু দিয়ে করা হচ্ছে। এতে শ্রমনির্ভর সরকারি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার হরিলুট চলছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
কাগজে ‘শ্রমিক’, মাঠে ‘ভেকু’: নীতিমালার চরম লঙ্ঘন
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী,টিআর,কাবিখা এবং কাবিটা কর্মসূচিগুলোর মূল লক্ষ্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ দরিদ্র ও কর্মহীন জনগোষ্ঠীর জন্য আপদকালীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
শ্রমিক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা:এসব প্রকল্পের মাটি কাটার কাজ সম্পূর্ণভাবে মানবশ্রম বা স্থানীয় দিনমজুর শ্রমিকদের দ্বারা করাতে হবে।
ভেকু ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা:কোনোভাবেই ভেকু বা মাটি কাটার কোনো যান্ত্রিক মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। ভেকু ব্যবহার করলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য (দরিদ্রদের কর্মসংস্থান) ব্যাহত হয়।
টপ সয়েল ধ্বংস:আইন অমান্য করে রাস্তার মাটি ভরাট করার জন্য ফসলি জমির উর্বরা উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) কেটে নেওয়া হচ্ছে,যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
শাস্তিমূলক বিধান:নীতিমালা লঙ্ঘন করে মেশিন দিয়ে মাটি কাটলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কমিটির (PIC) বিরুদ্ধে বরাদ্দ বাতিল, অর্থ আত্মসাতের ফৌজদারি মামলা এবং বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
মাস্টাররোলের শুভঙ্করের ফাঁকি ও হরিলুটের সমীকরণ
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী,প্রতি ১,০০০ সিএফটি (CFT) মাটি কাটার জন্য শ্রমিকদের মজুরি বাবদ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ের প্রাক্কলন (Estimate) অনুযায়ী, ১ মেট্রিক টন চাল বা গম বরাদ্দের বিপরীতে গড়ে প্রায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ সিএফটি (CFT) বা ঘনফুট মাটি কাটার কথা।
যদি একটি আদর্শ গ্রামীণ রাস্তা ১০ ফুট চওড়া এবং ২ ফুট উঁচু হয়,তবে প্রতি ১ ফুট লম্বা রাস্তার জন্য মাটি লাগবে ২০ ঘনফুট (CFT)।সেই হিসাবে ১ টন খাদ্যের বরাদ্দে প্রায় ১,০০০ ফুট লম্বা রাস্তা তৈরি হওয়ার কথা।
বর্তমানে প্রতি টন চালের সরকারি বাজার মূল্য প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৪২,০০০ টাকা এবং গমের মূল্য ২৮,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা ধরা হয়ে থাকে।স্থানীয়দের অভিযোগ,ভেকু ব্যবহার করার কারণে ১,০০০ ফুট রাস্তার মাটি কাটতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে।অথচ নথিপত্রে শত শত ভুয়া শ্রমিকের নাম ও ভুয়া টিপসই-স্বাক্ষর দেখিয়ে মাস্টাররোল তৈরি করা হয়।ভেকু ব্যবহারের মাধ্যমে মূলত ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে সরকারি টাকা ও খাদ্যশস্য আত্মসাতের নিরাপদ পথ তৈরি করা হয়েছে।
তদারকি কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারিভাবে বহুস্তরের তদারকি কমিটি রয়েছে।নিয়ম অনুযায়ী, কাজ শুরুর আগে ও পরে ছবি-ভিডিও ধারণ এবং উপজেলা প্রকৌশলী বা পিআইও (PIO) অফিস কর্তৃক বাধ্যতামূলকভাবে “প্রাক্কলন” বা এস্টিমেট করার বিধান রয়েছে।প্রতিটি প্রকল্পে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ করা হয় এবং তিনি সরেজমিনে কাজ মূল্যায়ন না করা পর্যন্ত বিল পাস হওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া পিআইও অফিস কারিগরি মান, দৈর্ঘ্য ও মাটির পরিমাপ (CFT) যাচাই করার কথা।
শ্রীপুর হাইস্কুল সংলগ্ন রাস্তায় ভেকু ব্যবহারের অকাট্য চিত্র (“sreepur high school road.png”) সামনে আসার পর সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন—তদারকি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কী ভূমিকা পালন করেছেন? তারা কি মেজারমেন্ট বুক এবং এস্টিমেট বুক যাচাই না করেই বিল পাস করে দিয়েছেন?
তদন্ত ও অডিটের দাবি
মেহেন্দিগঞ্জের সচেতন নাগরিকরা দাবি জানিয়েছেন,বিগত ১৮-১৯ বছরে উপজেলায় টিআর,কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে কত টন খাদ্যশস্য ও টাকা বরাদ্দ এসেছে,কোন কোন রাস্তার জন্য বরাদ্দ হয়েছে, তার প্রকল্পভিত্তিক এস্টিমেট,মেজারমেন্ট বুক,মাস্টাররোল এবং বিল-ভাউচার জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।একই সাথে এই দীর্ঘমেয়াদী অনিয়মের একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ অডিট (নিরীক্ষা) করার দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (PIO), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংবাদে যুক্ত করা হবে।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
