মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা যেন এক ভয়াবহ স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।প্রতিদিন কোথাও না কোথাও একজন নারী স্বামীর হাতে, শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনে,যৌতুকের দাবিতে কিংবা পারিবারিক সহিংসতার নির্মম শিকার হচ্ছেন।কয়েকদিনের আলোচনার পর নতুন আরেকটি ঘটনা পুরোনোটিকে চাপা দিয়ে দেয়। কিন্তু নিহত নারীর পরিবার সারাজীবন বয়ে বেড়ায় সেই ক্ষত।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের সাম্প্রতিক ঘটনাটি আবারও আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—একজন মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে নিজের স্ত্রীর গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করতে পারে?আরও বড় প্রশ্ন হলো,এমন সহিংসতার পূর্বাভাস কি আগে ছিল না?অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর হচ্ছে—ছিল। কিন্তু পরিবার,প্রতিবেশী ও সমাজ সেটিকে গুরুত্ব দেয়নি।
আমাদের সমাজে এখনও একটি ভয়ংকর সংস্কৃতি টিকে আছে।মেয়েদের শেখানো হয়,“সংসার করতে হলে সহ্য করতে হবে।” মারধর সহ্য করো,অপমান সহ্য করো, আর্থিক নির্যাতন সহ্য করো,মানসিক নির্যাতন সহ্য করো। যেন বিয়ের সঙ্গে একজন নারীর মৌলিক মানবাধিকারও স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
অনেক বাবা-মা মেয়ের কান্না শুনেও বলেন,“ফিরে এলে সমাজ কী বলবে?” এই প্রশ্নের উত্তর আজ সময় দিয়েছে—সমাজ কিছুদিন কথা বলে,তারপর ভুলে যায়; কিন্তু কবরের নিচে শুয়ে থাকা মেয়েটি আর ফিরে আসে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো,পারিবারিক সহিংসতাকে এখনও অনেকেই ‘পারিবারিক ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যেতে চান।অথচ একজন নারীকে নিয়মিত মারধর করা, শ্বাসরোধ করা,আগুনে পোড়ানো বা হত্যার হুমকি দেওয়া কোনো পারিবারিক বিষয় নয়; এটি সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ।
রাষ্ট্রেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।নারীনির্যাতনের মামলার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়,অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পায় না।অপরাধীরা যখন দেখে শাস্তি এড়ানো সম্ভব,তখন সহিংসতার সাহস আরও বেড়ে যায়।দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির দৃশ্যমান নজির ছাড়া এই প্রবণতা কমানো কঠিন।
তবে শুধু আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। যে পরিবার মেয়েকে বলে “সহ্য করো”, সেই পরিবার অনিচ্ছাকৃতভাবে নির্যাতনকারীর পক্ষেই দাঁড়ায়।যে প্রতিবেশী নির্যাতনের শব্দ শুনেও নীরব থাকে, সেও এক অর্থে সহিংসতার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
আজ দেশের প্রতিটি বাবা-মায়ের কাছে প্রশ্ন—আপনার মেয়ে যদি প্রতিদিন নির্যাতনের শিকার হয়,তবে কি শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবেন?একটি ভাঙা সংসার মেরামত করা যায়,কিন্তু একটি হারানো জীবন কখনো ফিরিয়ে আনা যায় না।
নারীর জীবন কোনো সামাজিক সম্মানের চেয়ে ছোট নয়। কোনো সংসার,কোনো সম্পর্ক,কোনো লোকলজ্জা একজন মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।
আর কত নারীর রক্ত ঝরলে আমরা বুঝব—নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়,নীরবতা অনেক সময় অপরাধেরই সহযোগী? এখনই সময় পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে দাঁড়ানোর।অন্যথায় আগামীকালের সংবাদে শুধু বদলাবে নাম,বদলাবে জেলা; কিন্তু গল্প একই থাকবে—আরেকজন নারী নিহত, আরেকটি পরিবার ধ্বংস, আরেকটি সমাজের ব্যর্থতা।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
