নিজস্ব প্রতিবেদক।।নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দেশে উদ্বেগজনকভাবে আলোচিত হলেও, এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুতর সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে—নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর ছবি, ভিডিও, পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ভিকটিমের ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি ভিউ, ফলোয়ার, বিজ্ঞাপন আয় কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রচারণার সুবিধা নিচ্ছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু অনৈতিক নয়, বরং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত)-এর চেতনা ও বিভিন্ন বিধানের সরাসরি পরিপন্থী। বিশেষ করে ধারা ১৪ অনুযায়ী নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর পরিচয়, ছবি বা এমন তথ্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ, যা থেকে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়।
ভিকটিমের দ্বিতীয়বার নির্যাতন
মানবাধিকারকর্মীদের ভাষায়, ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার একজন নারী বা শিশু যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার প্রচারিত হয়, তখন সে কার্যত দ্বিতীয়বার মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।
এতে—
সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে;
পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়;
শিক্ষা ও কর্মজীবনে বাধা সৃষ্টি হয়;
সাক্ষী ও ভিকটিমের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়;
বিচার প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আইন কী বলছে?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত) অনুযায়ী বিভিন্ন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহের শাস্তি
ধারা ৪: অ্যাসিড বা দহনকারী পদার্থ দ্বারা গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যু ঘটালে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
ধারা ৭: নারী বা শিশু অপহরণ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
ধারা ৮: মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
ধারা ৯: ধর্ষণের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড; ধর্ষণের ফলে মৃত্যু ঘটলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
ধারা ৯ক: আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান।
ধারা ৯খ: বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন সংক্রান্ত অপরাধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
ধারা ১০: যৌন নিপীড়ন বা শ্লীলতাহানির জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
ধারা ১১: যৌতুকের জন্য মৃত্যু, জখম বা নির্যাতনের ক্ষেত্রে কঠোর কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন বা অর্থদণ্ড।
ধারা ১২: ভিক্ষাবৃত্তি বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে শিশুকে অঙ্গহানি করলে কঠোর শাস্তি।
ধারা ১৪: নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ধারা ১৭: মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের করলে শাস্তির বিধান রয়েছে।
ধারা ৩০: অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনা দিলেও মূল অপরাধীর সমপর্যায়ের শাস্তি হতে পারে।
ভিকটিম সুরক্ষার জন্য আইনে যা আছে
আইনে ভিকটিমদের জন্য বিভিন্ন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার;
সাক্ষীর নিরাপত্তা;
গোপনীয়তা রক্ষা;
ডিএনএ পরীক্ষা;
নিরাপত্তামূলক হেফাজত;
দ্রুত তদন্ত ও বিচার;
ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা।
বিশেষ করে ধারা ৩২খ সাক্ষী ও ভিকটিম সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রদান করে।
বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন
সমালোচকরা বলছেন, আইনে কঠোর বিধান থাকলেও বাস্তবে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর ছবি, ভিডিও ও ব্যক্তিগত তথ্য ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশের ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির চেয়ে ভিকটিমের পরিচয়ই বেশি প্রচারিত হয়।
ফলে ভিকটিমকে সামাজিক, মানসিক ও পারিবারিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির মর্যাদা, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষা করাও রাষ্ট্র, সমাজ, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের সমান দায়িত্ব।
কোনো নির্যাতিত নারী বা শিশুর ছবি, ভিডিও বা পরিচয় প্রকাশ করে ভিউ, লাইক, শেয়ার বা আর্থিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা মানবিকতা, নৈতিকতা এবং আইনের দৃষ্টিতে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এটি বিচারপ্রার্থীর অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাকে আজীবন সামাজিক কলঙ্কের বোঝা বহন করতে বাধ্য করে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আদালত, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সমন্বিত দায়িত্ব হলো ভিকটিমের পরিচয় গোপন রাখা এবং আইন অনুযায়ী তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো নির্যাতনের ঘটনা প্রচার করতে হলে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে, কিন্তু ভিকটিমকে শনাক্ত করা যায় এমন ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ আইন ও নীতিশাস্ত্র উভয়ের দৃষ্টিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং অনেক ক্ষেত্রে শাস্তিযোগ্য।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
