নিজস্ব প্রতিবেদক।।আছিয়া,তায়েবা, সায়মা, ময়না আক্তার, ফাহিমা,রামিশা,আয়েশা,তাহিতা,দোলা— এরা শুধু নাম নয়; এরা বাংলাদেশের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রক্তাক্ত প্রশ্ন। একের পর এক শিশু ধর্ষণ,পাশবিক নির্যাতন ও নির্মম হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আতঙ্ক বাড়ছে।মানবাধিকার সংগঠন,সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ— বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা ও রায় কার্যকরে বিলম্বের কারণেই অপরাধীরা ভয় হারিয়ে ফেলছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী,২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক),হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ পরিসংখ্যান।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী—
২০২৪ সালে দেশে অন্তত ৫১৬টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল শিশু।বহু ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগও উঠে আসে।
২০২৫ সালে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮২৮টি ঘটনায়। এর মধ্যে প্রায় ৪৭৪ জন ভুক্তভোগী ছিল শিশু।
২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে দাবি করা হয়েছে,গত প্রায় ২০ মাসে ধর্ষণ,নির্যাতন ও সহিংসতায় শত শত শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং শিশু নির্যাতনের হাজারো মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন,শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার না হওয়া এবং রায় কার্যকর হতে বছরের পর বছর লেগে যাওয়াই অপরাধীদের মধ্যে ভয়হীনতা তৈরি করছে।
আলোচিত মামলাগুলো ও বিচারহীনতার অভিযোগ
মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেও উচ্চ আদালতের আপিল প্রক্রিয়ায় তা এখনো কার্যকর হয়নি বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।একইভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির অভিযোগ তুলে আসছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে,বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে অনেক ক্ষেত্রে বিচার না হওয়ার সমান।এতে ভুক্তভোগী পরিবার মানসিক ও আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং সমাজে ভুল বার্তা যায়।
২১ কার্যদিবসে বিচার সম্পন্নের দাবি
শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন,বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবিগুলো হলো—
শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার জন্য বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক ট্রাইব্যুনাল গঠন
তদন্ত ও বিচার সর্বোচ্চ ২১ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন
আপিল প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকারভিত্তিক শুনানি
দোষী সাব্যস্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাংবিধানিক অধিকার,ন্যায়বিচারের মানদণ্ড এবং আপিলের সুযোগও বজায় রাখতে হবে। তাদের মতে, কার্যকর তদন্ত,সাক্ষী সুরক্ষা এবং বিচারিক দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া শুধু কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়ে অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিতর্ক
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।কিছু মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক দাবি করছেন,সাম্প্রতিক সময়ে সহিংস অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সরকারপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন,শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; এটি সামাজিক, নৈতিক ও পারিবারিক অবক্ষয়েরও প্রতিফলন।সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি,প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক মূল্যবোধ জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
দেশজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন—
আছিয়া,রামিশা,তামান্না কিংবা নাম না জানা হাজারো শিশুর আর কত মৃত্যু হলে বিচারব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে দ্রুত, কার্যকর ও দৃশ্যমান হবে?
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
