মাজহারুল ইসলাম।।একটি ছোট্ট শিশু।আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল।যে বাড়িকে নিরাপদ আশ্রয় ভাবার কথা, সেই বাড়িতেই অভিযোগ অনুযায়ী খালু ও খালাত ভাইয়ের হাতে ধর্ষণের শিকার হলো সে।তারপর অপরাধ চাপা দিতে তাকে হত্যা করে ছাদের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হলো— আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার জন্য।
এমন একটি ঘটনার পর একটি সভ্য রাষ্ট্র কেঁপে ওঠার কথা ছিল।
টেলিভিশনের পর্দা উত্তপ্ত হওয়ার কথা ছিল।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার কথা ছিল।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের ঘোষণা আসার কথা ছিল।
কিন্তু কিছুই হয়নি।
কারণ শিশুটির নাম তামান্না।
কারণ ঘটনাটি ঢাকার বাইরে।
কারণ ঘটনাটি “ভাইরাল” হয়নি।
আজকের বাংলাদেশে এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বাস্তবতা— বিচার ও মানবিকতা যেন এখন সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরশীল।কোনো ঘটনা ভাইরাল হলে প্রশাসন দৌড়ায়, মিডিয়া সরব হয়,রাজনৈতিক বক্তব্য আসে।আর আলোচনার বাইরে থাকা হাজারো শিশু নীরবে হারিয়ে যায়।
তামান্না তাদেরই একজন।
এই মামলায় সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় শুধু ধর্ষণ বা হত্যাই নয়; বরং পুরো ঘটনার নির্মমতা।অভিযোগ অনুযায়ী,একটি শিশুকে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে শুধুমাত্র সে সত্য বলে দিতে পারে— এই ভয়ে।এর চেয়ে ভয়ংকর পশুত্ব আর কী হতে পারে?
তারপরও বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকে।
আসামিরা জামিন পায়।
পরিবার আতঙ্কে থাকে।
সাক্ষীরা চাপে থাকে।
আর সমাজ ধীরে ধীরে ঘটনাটি ভুলে যায়।
এটি শুধু বিচারব্যবস্থার ধীরগতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক।
শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার কেন এত দীর্ঘ হবে? কেন একটি পরিবারকে দুই বছর,তিন বছর,কখনো দশ বছর পর্যন্ত আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হবে? কেন এমন মামলার আপিল নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ বেঞ্চ থাকবে না? কেন সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে না?
রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিশুদের নিরাপত্তা দিতে চায়,তাহলে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলাকে সাধারণ মামলার মতো দেখলে চলবে না। প্রয়োজন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং উচ্চ আদালতেও অগ্রাধিকারভিত্তিক শুনানি।
মিডিয়ার ভূমিকাও এখানে প্রশ্নের মুখে।
অনেক সংবাদমাধ্যম এখন মানুষের কান্নার চেয়ে “ট্রেন্ড” বেশি দেখে। ফলে গ্রামগঞ্জের অসংখ্য তামান্না সংবাদ শিরোনাম হয় না।অথচ সাংবাদিকতার মূল দায়িত্বই হচ্ছে— যাদের কণ্ঠ নেই, তাদের কণ্ঠ হওয়া।
তামান্নার পরিবারের পাশে আজ পুরো দেশ নেই।
কিন্তু তাই বলে তাদের বিচার পাওয়ার অধিকার কমে যায় না।
বরিশাল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামির জামিন বাতিল করে পুনরায় কারাগারে পাঠিয়েছে— এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।কিন্তু এটিই শেষ নয়।এখন প্রয়োজন দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ, নিরপেক্ষ বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
কারণ একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা মাপা হয় সে রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, তার ওপর।
যদি তামান্নার মতো শিশুরাও ন্যায়বিচার না পায়, তাহলে উন্নয়ন,রাজনীতি,ক্ষমতা— সবকিছুই অর্থহীন।
এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাবে—
এই দেশে কি বিচার পেতে হলে আগে “ভাইরাল” হতে হয়?
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.